মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে সহজ, সরল এবং দলিলভিত্তিক লেখনীর মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর আকীদা সংশোধন এবং সুন্নাহর প্রচারে যিনি অত্যন্ত নিরলস ও প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছেন, তিনি হলেন শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু (রহ.)। তিনি বিশেষ করে ছোট ছোট পুস্তিকা ও প্রশ্নোত্তরধর্মী বই লেখার জন্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত ছিলেন, যা অত্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছেও খাঁটি দ্বীনি জ্ঞান পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিল। এই প্রখ্যাত সিরিয়ান আলেম, শিক্ষাবিদ ও লেখকের বিস্তারিত জীবনী উপস্থাপন করা হলো।


১. জন্ম ও জন্মস্থান

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু হিজরী ১৩৪৪ সনে (মোতাবেক ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে) সিরিয়ার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শহর আলেপ্পো (Aleppo)-তে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।


২. শিক্ষাজীবন ও আকীদা পরিবর্তনের ঘটনা

তার প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষা দীক্ষা নিজ শহর আলেপ্পোতেই সম্পন্ন হয়। তিনি শৈশবেই পবিত্র কুরআন হিফজ করেন।

  • প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা: তিনি আলেপ্পোর বিখ্যাত ‘দারুল মুয়াল্লিমীন’ (শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ) থেকে ডিগ্রী লাভ করেন এবং দীর্ঘকাল সিরিয়ার বিভিন্ন সরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
  • সুফীবাদ থেকে সালাফী আকীদা: শাইখ যাইনু তার জীবনের প্রথমার্ধে তৎকালীন সিরিয়ার প্রচলিত পরিবেশ অনুযায়ী সুফী তরীকায় (বিশেষ করে নকশবন্দী তরীকায়) দীক্ষিত ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি যখন নিজেই কুরআন ও সহীহ হাদীস গভীরভাবে অধ্যয়ন শুরু করেন, তখন বুঝতে পারেন যে প্রচলিত অনেক আমল ও বিশ্বাসের সাথে সুন্নাহর অমিল রয়েছে। এরপর তিনি মহান আল্লাহ ও নবীজী (সা.)-এর খাঁটি তাওহীদী আকীদা ও সালাফে সালেহীনের মানহাজ (পদ্ধতি) গ্রহণ করেন এবং আমৃত্যু এই খাঁটি আকীদার প্রচারেই নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।

৩. মক্কা ও মদিনায় হিজরত এবং কর্মজীবন

সিরিয়ায় সুন্নাহর দাওয়াত দিতে গিয়ে তিনি তৎকালীন কিছু বিদআতী গোষ্ঠী ও গোঁড়া আলেমদের চরম বিরোধিতার মুখোমুখি হন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবে হিজরত করেন।

  • মক্কার দারুল হাদীসে শিক্ষকতা: সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ.) শাইখ যাইনুর গভীর ইলম ও সুন্দর স্বভাব দেখে তাকে মক্কার বিখ্যাত “দারুল হাদীস আল-খায়রিয়াহ” (Dar al-Hadith al-Khairiyyah) নামক উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেন।
  • দীর্ঘ স্থায়ী খেদমত: তিনি মক্কার এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে সুদীর্ঘ কয়েক দশক ধরে হাদীস, আকীদা এবং তাফসীর শাস্ত্রের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মক্কায় পড়তে আসা হাজার হাজার শিক্ষার্থী তার কাছ থেকে সরাসরি ইলম অর্জন করেন।

৪. ইসলামে কৃতিত্ব ও লেখার অনন্য বৈশিষ্ট্য

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনুর দাওয়াহ পদ্ধতির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল— চরম সহজবোধ্যতা ও সংক্ষিপ্ততা

  • প্রশ্নোত্তর পদ্ধতি: তিনি জটিল কোনো দার্শনিক তত্ত্বের আশ্রয় না নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে জাগা প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে “প্রশ্ন ও উত্তর” (Question & Answer) আকারে বই লিখতেন। এর ফলে একজন সাধারণ পাঠক খুব সহজেই ইসলামের মূল বিষয়গুলো বুঝে নিতে পারত।
  • দলিলভিত্তিক আলোচনা: তার প্রতিটি কথার পেছনে পবিত্র কুরআন ও সহীহ বুখারী বা মুসলিমের স্পষ্ট দলিলের উদ্ধৃতি থাকত।
  • বিশ্বব্যাপী বইয়ের প্রচার: সৌদি আরবের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা এবং হজ্জ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শাইখ যাইনুর বইগুলো কোটি কোটি কপি ছাপিয়ে সারাবিশ্বের হাজীদের মাঝে এবং বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরিতে বিনামূল্যে বিতরণ করা হতো।

৫. তার বিখ্যাত রচনাবলী (বাংলায় অনূদিত বইসমূহ)

শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু বেশ কিছু কালজয়ী ও ছোট ছোট বই লিখেছেন। বাংলাদেশে তার প্রায় সবকটি বই-ই বাংলায় অনূদিত হয়েছে এবং অহীভিত্তিক দ্বীন চর্চায় এগুলো পাঠকদের টেবিলে অত্যন্ত সমাদৃত। তার বিখ্যাত কিছু বই হলো:

১. খুয আকী দাতাক (خذ عقيدتك) – তোমার আকীদা সংশোধন করো: এটি তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত এবং বহুল পঠিত বই। প্রশ্নোত্তর আকারে ঈমান ও আকীদার মৌলিক বিষয়গুলো এতে খুব চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
২. ইসলামের স্তম্ভ ও ঈমানের রুকনসমূহ: তাওহীদ, সালাত, যাকাত, হজ্জ এবং ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের সহজ ব্যাখ্যা।
৩. নবী কারীম (সা.)-এর সালাত ও দোয়ার পদ্ধতি: রাসূলুল্লাহ (সা.) যেভাবে সালাত আদায় করতেন এবং তার সুন্নাত সম্মত দোয়া ও জিকিরসমূহ।
৪. আদর্শ পরিচ্ছন্ন সমাজ গঠনে ইসলামের দিকনির্দেশনা: মুসলিম সমাজের নৈতিক ও চারিত্রিক উন্নয়নের উপায়।
৫. সুফীবাদের হাকীকত ও পর্যালোচনা: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সুফীবাদের বিভিন্ন অতিরঞ্জন ও বিশ্বাসের তাত্ত্বিক খণ্ডন।


৬. ইন্তিকাল

সুদীর্ঘকাল মক্কার পবিত্র ভূমিতে থেকে বিশ্বজুড়ে তাওহীদ ও সুন্নাহর আলো ছড়িয়ে, এই মুখলিস আলেম ও শিক্ষক হিজরী ১৪৩১ সনের ২১শে শওয়াল (মোতাবেক ২০১০ সালের ৩রা অক্টোবর) শুক্রবার ৮৫ বছর বয়সে মক্কা মুকাররমায় ইন্তেকাল করেন।

পবিত্র মসজিদুল হারামে তার জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয় এবং লক্ষ লক্ষ ওলামা ও মুসুল্লির উপস্থিতিতে মক্কার মাটিতেই তাকে দাফন করা হয়। তার রেখে যাওয়া সহজ ও সরল সাহিত্যসমূহ আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষকে অন্ধ অনুকরণ ও শিরক-বিদআতের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে সুন্নাহর আলো দেখাতে সাহায্য করছে।

আল্লাহ তাআলা শাইখ মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনুর সমস্ত দ্বীনি খেদমত কবুল করে তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু বই হলো :

১. আরকানুল ইসলাম ওয়াল ঈমান

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



২. ইসলামী আকীদা বিষয়ক কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ মাসয়াল

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৩. ইসলামী আকীদাহ

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



৪. ইসলামী জীবন পদ্ধতি

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৫. ইসলামে গান ছবি ও প্রতিকৃতির বিধান

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৬. ঈমান ইসলামের মূলভিত্তি ও ইসলামী আকীদা বিশ্বাস

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৭. কিভাবে তাওহীদের দিশা পেলাম

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৮. ফির্কাহ নাজিয়াহ ও সাহায্য প্রাপ্ত জামায়াতের মতাদর্শ

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



০৯. ব্যক্তি ও সমাজ সংশোধনে ইসলামী দিক নির্দেশনা

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



১০. মাবরুর হজ্জ

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



১১. মুক্তিপ্রাপ্ত দলের পাথেয়

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



১২. শিশুদের লালন পালনে দায়িত্ব ও করণীয়

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



১৩. সন্তান প্রতিপালন

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



১৪. সুফিবাদ

লেখক : মুহাম্মদ ইবনে জামিল যাইনু



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"