ড. ইয়াদ কুনাইবী

ড. ইয়াদ কুনাইবী (Dr. Eyad Qunaibi) বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জর্ডানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক, লেখক এবং একই সাথে একজন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞানী। বিশেষ করে সমকালীন নাস্তিক্যবাদ, বস্তুবাদ, বিবর্তনবাদ এবং আধুনিক পশ্চিমা মতাদর্শের বিরুদ্ধে কুরআন, সুন্নাহ ও আধুনিক বিজ্ঞানের সমন্বয়ে যৌক্তিক খণ্ডন ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।

১. জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

  • জন্ম: তিনি ১৯৭৫ সালের ২২শে অক্টোবর কুয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি মূলত জর্ডানের নাগরিক।
  • পারিবারিক পরিবেশ: তাঁর পরিবার ছিল একটি উচ্চশিক্ষিত এবং দ্বীনদার পরিবার। শৈশব থেকেই তিনি পড়াশোনার প্রতি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন এবং তাঁর পরিবার তাঁর এই জ্ঞানার্জনের স্পৃহাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করেছে।

২. শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বৈজ্ঞানিক কর্মজীবন

ড. ইয়াদ কুনাইবী একাধারে দ্বীনি জ্ঞান এবং আধুনিক বিজ্ঞান—উভয় ক্ষেত্রেই সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন পণ্ডিত।

  • ফার্মেসী ডিগ্রি: তিনি জর্ডান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (JUST) থেকে ১৯৯৮ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সে ব্যাচেলর (B.Pharm) ডিগ্রি লাভ করেন।
  • পিএইচডি (PhD): এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। ২০০৩ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি আমেরিকার বিখ্যাত হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয় (University of Houston) থেকে ফার্মাকোলজি (Pharmacology) বা ওষুধবিদ্যায় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
  • অধ্যাপনা ও গবেষণা: পিএইচডি শেষ করে তিনি জর্ডানে ফিরে আসেন এবং সেখানকার বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি জর্ডানের আম্মানে অবস্থিত আল-আহলিয়া আম্মান ইউনিভার্সিটি (Al-Ahliyya Amman University)-র ফার্মেসী অনুষদে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সায়েন্টিফিক জার্নালে তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।

৩. দ্বীনি শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন

বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি তিনি সনাতনী বা ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতিতে ইসলামী জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করার পাশাপাশি শরিয়াহর বিভিন্ন শাখা, যেমন—আকিদা, তাফসীর, হাদীস এবং ফিকহ শাস্ত্রের ওপর জর্ডানের প্রখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেন। বিজ্ঞান ও ধর্মের এই অপূর্ব সমন্বয়ই তাঁর দাওয়াতি কাজকে অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

৪. ইসলামে অবদান ও দাওয়াতি কার্যক্রম

ড. ইয়াদ কুনাইবীর মূল অবদান হলো আধুনিক সংশয়বাদ ও নাস্তিক্যবাদের জোয়ার থেকে মুসলিম যুবসমাজকে রক্ষা করা।

ক) ‘দ্য জার্নি অফ সার্টেইনটি’ (رحلة اليقين – রেহলাতুল ইয়াকীন):

এটি ড. ইয়াদ কুনাইবীর জীবনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও যুগান্তকারী ভিডিও সিরিজ। ইংরেজিতে একে “The Journey of Certainty” বা বাংলায় “নিশ্চয়তার যাত্রা” বলা হয়।

  • এই সিরিজে তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ (Evolution Theory), নাস্তিক্যবাদ, এবং বস্তুবাদের অসারতা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন।
  • তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আধুনিক বিজ্ঞান আসলে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার নয়, বরং আরও দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করে। এই সিরিজটি ইংরেজি, বাংলাসহ পৃথিবীর বহু ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

খ) সমকালীন মতাদর্শের খণ্ডন:

তিনি পশ্চিমা নারীবাদ (Feminism), ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism), উদারতাবাদ (Liberalism) এবং সমকামিতার মতো আধুনিক বিষয়গুলোকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোকে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। যুবসমাজ কেন এই ফাঁদে পা দিচ্ছে এবং এর থেকে মুক্তির উপায় কী, তা তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।

g) সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা:

তিনি মুসলিম উম্মাহর বর্তমান পতন, ফিলিস্তিন সংকট এবং রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার। উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে হকের পক্ষে কথা বলার কারণে তাঁকে জর্ডান সরকারের কোপানলে পড়তে হয়েছে এবং ২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় এক বছর তিনি কারাবরণও করেন। কিন্তু কারাগারও তাঁর দাওয়াতি কাজকে থামাতে পারেনি।

৫. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থাবলী (Books)

ভিডিও লেকচারের পাশাপাশি তাঁর লেখা বেশ কিছু কিতাব ও প্রবন্ধ রয়েছে, যা ব্যাপক সমাদৃত। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো:

১. রাওয়াজিউল হিজরাহ (روادع الهجرة): আত্মশুদ্ধি ও দ্বীনের পথে অবিচল থাকার নির্দেশিকা।

۲. তাযকিরাতুল হাফিজ (تذكرة الحافظ): কুরআন হিফজকারী ও ধারণকারীদের জন্য একটি দিকনির্দেশনামূলক বই।

৩. مقالات ইয়াদ কুনাইবী (প্রবন্ধ সংকলন): সমসাময়িক নানা ফিতনা ও চিন্তাধারার জবাব সংকলিত বই।

ড. ইয়াদ কুনাইবী কেন বর্তমান যুগে গুরুত্বপূর্ণ?

আজকের দিনে যেখানে সাধারণ শিক্ষা ও দ্বীনি শিক্ষার মধ্যে একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেখানে ড. ইয়াদ কুনাইবী একজন জীবন্ত উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন মানুষ একই সাথে বিশ্বমানের বিজ্ঞানী এবং একজন খাঁটি ইসলামিক স্কলার হতে পারেন। বিজ্ঞানকে অস্ত্র বানিয়ে যারা ইসলামকে আক্রমণ করতে চায়, তাদের জবাব দেওয়ার জন্য ড. ইয়াদ কুনাইবী বর্তমান বিশ্বের অন্যতম এক ধারালো তলোয়ার। তাঁর যুক্তিপূর্ণ, শান্ত ও বিজ্ঞানভিত্তিক উপস্থাপনা লাখ লাখ তরুণকে নাস্তিক্যবাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরিয়ে এনেছে।

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

১. আয়নাঘর

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী



২. ইসলাম প্রতিষ্ঠা সমকালীন ভাবনায় সৃষ্ট ভ্রান্তি নিরসন

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী



০৩. নারী স্বাধীনতার স্বরূপ

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী



০৪. নিফাক থেকে বাঁচুন

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী



০৫. বিপদ যখন নিয়ামত

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী



০৬. বিশ্বাসের অভিযাত্রা

লেখক : ড. ইয়াদ কুনাইবী


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"