শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ

ইসলামী অঙ্গনে বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয়, স্পষ্টভাষী ও প্রভাবশালী প্রবীণ আলেম, দাঈ এবং ওয়ায়েজ হলেন শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ। গত কয়েক দশক ধরে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে সমাজ সংস্কার, শিরক-বিদআতের প্রতিবাদ এবং সালাফী বা আহলে হাদীস মানহাজ (আদর্শ) প্রচারে তিনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, স্পষ্ট উপস্থাপনা এবং আপসহীন বক্তব্য তাকে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত করে তুলেছে। এই প্রখ্যাত আলেমের জীবন, কর্ম এবং অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. জন্ম ও জন্মস্থান

শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ ১৯৬২ সালে (মতান্তরে ১৯৬৪) বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার একটি সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনদার মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব ও প্রাথমিক জীবন নিজ গ্রামেই কেটেছে।

২. শিক্ষাজীবন: দেশ ও বিদেশ

তার শিক্ষাজীবন ছিল সুদীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। তিনি দেশের বিভিন্ন নামকরা দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার পাশাপাশি ভারতের বিখ্যাত ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: নিজ এলাকার মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর তিনি বালিয়াডাঙ্গা দারুল হাদিস মাদরাসা ও নাচোল উপজেলার আকন্দপুর মাদরাসায় কিছুদিন পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি ঐতিহ্যবাহী আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী (রাজশাহী) সহ দেশের বিভিন্ন নামকরা সালাফী মাদরাসায় ইলমে দ্বীন অর্জন করেন।
  • উচ্চশিক্ষা (ভারত): বাংলাদেশে কামিল পরীক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ভারতে যান। সেখানে তিনি উত্তর প্রদেশের বিখ্যাত ‘جامعة إحياء العلوم’ (জামিয়া এহয়াউল উলূম) এবং পরবর্তীতে সালাফী ধারার শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠ ‘الجامعة السلفية’ (আল-জামিয়াতুস সালাফিয়্যাহ, বেনারস) থেকে ‘ফযীলত’ ও উচ্চতর হাদিস শাস্ত্রের ওপর ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে হাদীস, ফিকহ, আকীদা এবং আরবী সাহিত্যের ওপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

৩. কর্মজীবন ও শিক্ষকতা

শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ তার কর্মজীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করেছেন শিক্ষকতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দ্বীনি খিদমতে।

  • মুহাদ্দিস ও প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন: ভারত থেকে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে তিনি রাজশাহীর ডাঙ্গীপাড়া ‘আল-মারকাযুল ইসলামী আস-সালাফী’ মাদরাসায় শিক্ষকতা (মুহাদ্দিস) হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল (অধ্যক্ষ) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। তার হাত ধরে হাজারো ছাত্র সহিহ হাদীসের জ্ঞানে আলোকিত হয়ে দেশ-বিদেশে দাওয়াতী কাজ করছেন।
  • জুমআর খুতবা ও দেশব্যাপী দাওয়াহ: তিনি দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় মসজিদে খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—প্রতিটি প্রান্তে প্রতিনিয়ত ওয়াজ মাহফিল ও সেমিনারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।

৪. ইসলামে অবদান ও সমাজ সংস্কার

সমাজ থেকে অন্ধত্ব, কুসংস্কার ও জাল হাদীসের প্রচলন দূর করতে শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ অনন্য অবদান রেখে চলেছেন।

  • শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম: বাঙালি মুসলিম সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন লোকজ কুসংস্কার, মাজার সংস্কৃতি, পীরপূজা এবং ইবাদতের নামে প্রচলিত বিদআতের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর ভাষায় কথা বলেন।
  • সহিহ সুন্নাহর দাওয়াত: ইবাদতের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহর অনুসরণের ওপর তিনি সবচেয়ে বেশি জোর দেন। সমাজ ও পরিবারকে সুন্নাহ মোতাবেক পরিচালনার জন্য তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
  • পারিবারিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধ: যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয়, নারীদের বেপর্দা চলাফেরা, সুদ-ঘুষের ভয়াবহতা এবং পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি সবসময় তরুণ ও অভিভাবকদের সচেতন করে আসছেন।

৫. আল-জামিয়াহ আস-সালাফিয়্যাহ প্রতিষ্ঠা

শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী কীর্তি হলো ‘আল-জামিয়াহ আস-সালাফিয়্যাহ’ (Al-Jamiah As-Salafiyah) প্রতিষ্ঠা করা।

পদ্ধতিগত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি আদর্শ সালাফী ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি এটি গড়ে তোলেন। বর্তমানে এর দুটি বিশাল ক্যাম্পাস রয়েছে:

১. ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

২. রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ (ঢাকা)।

এই প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো—দরিদ্র ও মেধারী শিক্ষার্থীদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে আন্তর্জাতিক মানের ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলা, যাতে তারা ভবিষ্যতে যোগ্য দাঈ ও গবেষক হতে পারেন।

৬. লিখনী ও সাহিত্যকর্ম

বক্তৃতার পাশাপাশি শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই লিখেছেন, যা সাধারণ পাঠকদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়। তার বইগুলো মূলত সমাজ সংস্কার এবং দৈনন্দিন জীবনের আমল কেন্দ্রিক। তার উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. মরণ একদিন আসবেই: মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবন, কবর এবং পরকালের প্রস্তুতি নিয়ে লেখা একটি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী বই।

২. আদর্শ পরিবার: ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী কীভাবে একটি পরিবার গড়ে তুলতে হয়, স্বামী-স্ত্রীর অধিকার এবং সন্তান লালন-পালনের নির্দেশনা এতে রয়েছে।

৩. আদর্শ নারী: মুসলিম নারীদের পর্দা, মর্যাদা এবং সমাজ ও পরিবারে তাদের ভূমিকা নিয়ে রচিত।

৪. উপদেশ: মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা ভুলত্রুটি এবং তা সংশোধনের উপায় নিয়ে লেখা।

৫. কে বড় ক্ষতিগ্রস্ত?: সমাজে প্রচলিত কোন কোন ভুলের কারণে মানুষের আমল নষ্ট হয়ে যায়, তার একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।

৭. বক্তব্যের বৈশিষ্ট্য ও তুমুল জনপ্রিয়তা

সোশ্যাল মিডিয়ার (ইউটিউব, ফেসবুক) যুগে শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফের বক্তব্য কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। তার বক্তব্যের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো:

  • স্পষ্টবাদিতা: কোনো রকম ভণিতা বা তোষামোদ না করে সত্য কথাটি সরাসরি জনগণের সামনে তুলে ধরা।
  • দলিলভিত্তিক আলোচনা: তিনি তার বক্তব্যে সাধারণত কুরআন ও সহিহ বুখারী, মুসলিমসহ নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ থেকে সরাসরি উদ্ধৃতি (রেফারেন্স) প্রদান করেন।
  • আঞ্চলিক ও সাবলীল ভাষা: তার কথায় উত্তরবঙ্গের একটি চমত্কার আঞ্চলিক টান ও গুরুগম্ভীর ভাব রয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করে।

শায়খ আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ তার মেধা, শ্রম ও বলিষ্ঠ দাওয়াতের মাধ্যমে বাংলাদেশের সালাফী বা আহলে হাদীস আন্দোলনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছেন। আল্লাহ তাআলা এই মুখলিস দাঈর দ্বীনি খিদমতসমূহ কবুল করুন এবং তাকে সুস্থতার সাথে দীর্ঘজীবী করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু বই হলো :

০১. আদর্শ নারী

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০২. আদর্শ পরিবার

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৩. আদর্শ পুরুষ

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৪. উপদেশ

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৫. কে বড় ক্ষতিগ্রস্ত

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৬. কে বড় লাভবান

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৭. তাওযীহুল কুরআন

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৮. তাফসীর কি মিথ্যা হতে পারে

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



০৯. বক্তা ও শ্রোতার পরিচয়

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



১০. আইনে রাসুল (সা.) দোআ অধ্যায়

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ


১১. মরণ একদিন আসবেই

লেখক : আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"