শাইখ খালিদ আর-রাশিদ (Sheikh Khaled Al-Rashed) সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয়, প্রভাবশালী এবং আবেগদীপ্ত সৌদি দাঈ (ইসলাম প্রচারক)। তার পূর্ণ নাম খালিদ বিন মুহাম্মদ আর-রাশিদ। অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী, বলিষ্ঠ এবং আবেগঘন কণ্ঠস্বরের কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে তরুণ মুসলিম সমাজের কাছে অত্যন্ত পরিচিত। শাইখ খালিদ আর-রাশিদের জীবন, কর্ম ও দাওয়াতি অবদানের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন
শাইখ খালিদ আর-রাশিদ ১৯৭০ সালে সৌদি আরবে জন্মগ্রহণ করেন। তার প্রাথমিক জীবন সাধারণ যুবকদের মতোই কেটেছিল। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (USA) পাড়ি জমান এবং সেখানে আমেরিকান ফুটবল (American Football) খেলোয়াড় হিসেবেও কিছুদিন যুক্ত ছিলেন এবং অপরাধবিজ্ঞানের (Criminal Science) ওপর পড়াশোনা করেন।
২. জীবনের মোড় পরিবর্তন ও দ্বীনি শিক্ষা
আমেরিকায় অবস্থানকালেই এক বিশেষ ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবনে এক আমূল পরিবর্তন (হেদায়েত) আসে। তিনি খেলাধুলা ও প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে দ্বীনের পথে আত্মনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
- তিনি সৌদি আরবে ফিরে আসেন এবং মদীনা শরীফে দীর্ঘকাল অবস্থান করে ইসলামী শরীয়াহ ও হাদীস শাস্ত্রের ওপর গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
- তিনি সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল আজীজ বিন বায (রহ.) এবং বিখ্যাত ফকীহ শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রহ.)-এর মতো বিশ্ববরেণ্য আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে ইলম অর্জন করেন।
৩. দাওয়াতি পদ্ধতি ও জনপ্রিয়তা
শাইখ খালিদ আর-রাশিদের খুতবা ও বয়ানের শৈলী ছিল একেবারেই ভিন্ন। তিনি যখন বক্তব্য দিতেন, তখন উম্মাহর ব্যথায় এবং আল্লাহর ভয়ে তার নিজের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতো। তার বিখ্যাত কিছু বয়ান যেমন— “ইয়া উম্মাতি মুহাম্মাদ” (হে মুহাম্মাদের উম্মত), “আলা ইন্না নাসরাল্লাহি ক্বারীব” (নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী) লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তিনি মূলত আখিরাত, তাওবা, যুবসমাজের অবক্ষয় এবং মুসলিম উম্মাহর সংকটের ওপর বেশি জোর দিতেন।
৪. কারাবরণ
২০০৫ সালে ডেনমার্কের একটি পত্রিকায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করা হলে বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয়। সেই সময় শাইখ খালিদ আর-রাশিদ রাসুল (সা.)-এর সম্মানে অত্যন্ত ঐতিহাসিক ও ঝাঁঝালো একটি খুতবা দেন, যার শিরোনাম ছিল “ইয়া উম্মাতা মুহাম্মাদ” (يا أمة محمد)।
এই খুতবায় তিনি মুসলিম উম্মাহ ও শাসকদের তীব্রভাবে জাগ্রত হওয়ার আহ্বান জানান এবং রিয়াদে ডেনমার্কের দূতাবাসের সামনে প্রতিবাদের ডাক দেন। এই ঘটনার পরপরই ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালে তার মুক্তির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও, বিভিন্ন কারণে তার কারাদণ্ডের মেয়াদ আরও বৃদ্ধি করা হয়। বর্তমানেও তিনি কারাবন্দী রয়েছেন।

৫. বর্তমান অবস্থা ও প্রভাব
দীর্ঘ দুই দশক ধরে কারাগারে থাকলেও বিশ্বজুড়ে তার জনপ্রিয়তা বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং ইন্টারনেট, ইউটিউব এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কল্যাণে তার পূর্বের রেকর্ডকৃত বয়ানগুলো (উর্দু, বাংলা, ইংরেজি সাবটাইটেলসহ) প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ শুনছেন। বিশেষ করে বর্তমানের তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি আত্মশুদ্ধি এবং তাওবার এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
শাইখ খালিদ আর-রাশিদের কণ্ঠের সেই আকুলতা ও উম্মাহর প্রতি দরদ আজও বিশ্বের আনাচে-কানাচে কোটি মানুষের অন্তরে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ তাআলা উম্মাহর এই সিংহহৃদয় দাঈকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তাকে মুক্তি দিন। আমীন।
তার লিখিত কিছু কিতাবের লিংক :
০১. আল্লাহ আপনাকে দেখছেন
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০২. আল্লাহ তাওবাকারীকে ভালবাসেন
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৩. ইয়া উম্মতে মুহাম্মদ
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৪. এখনো কি ফিরে আসার সময় হয়নি
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৫. দু’আর মহিমা
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৬. নীড়ে ফেরার গল্প
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৭. পুণ্যময় আখেরাত
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৮. প্রতীক্ষার রমাদান
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
০৯. প্রতীক্ষিত মাহদি, দাজ্জাল ও ইয়াজুজ মাজুজ
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ
১০. হে যুবক ফিরে এসো রবের দিকে
লেখক : শাইখ খালিদ আর-রাশিদ









