হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী

বিংশ শতাব্দীর ইসলামি রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের ইতিহাসে যে ক’জন মহান মনীষী মুসলিম উম্মাহর চিন্তাগত, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক সংস্কারে আমূল পরিবর্তন এনেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছেন হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত মুফাসসির, অনন্য ফকিহ, সমাজ-সংস্কারক এবং বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সুফি সাধক। মুসলিম সমাজের ভেতর থেকে কুসংস্কার, ধর্মীয় শৈথিল্য এবং বিদআত দূর করে সুন্নাহর বিশুদ্ধ আলো ছড়িয়ে দেওয়ার কারণে তাঁকে উম্মাহর আত্মিক চিকিৎসক বা ‘হাকীমুল উম্মত’ এবং দ্বীনের মহান সংস্কারক বা ‘মুজাদ্দিদে মিল্লাত’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১. জন্ম, বংশ পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি

জন্ম ও জন্মস্থান:

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্ট (১২৮০ হিজরির ৫ রবিউস সানি) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার অন্তর্গত ‘থানা ভবন’ নামক একটি ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী মফস্বল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্ম এমন এক সময়ে হয়েছিল, যখন ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর ভারতের মুসলমানরা রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দিক থেকে চরম বিপর্যয় ও হতাশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

বংশ পরিচয়:

তিনি বংশগতভাবে অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও উচ্চ মর্যাদাশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতা শেখ আবদুল হক ছিলেন একজন পারসি ভাষার সুপণ্ডিত, প্রভাবশালী জমিদার এবং অত্যন্ত ধনাঢ্য ব্যক্তি। হযরত থানভী (রহ.)-এর বংশধারা পিতৃসূত্রে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমীরুল মুমিনীন হযরত উমর ফারুক (রা.)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এই কারণে পারিবারিক সূত্রে তাঁকে ‘ফারুকী’ বলা হয়। অন্যদিকে তাঁর মাতা ছিলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর বংশধর। ফলে তাঁর মধ্যে উমরি তেজস্বিতা এবং আলভী জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল।

শৈশব ও মাতৃহীনতা:

হযরত থানভী (রহ.)-এর বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর পুণ্যবতী মাতা ইন্তেকাল করেন। মায়ের ইন্তেকালের পর তাঁর পিতা শেখ আবদুল হক অত্যন্ত স্নেহ-মমতা ও কঠোর শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে দুই সন্তানকে (আশরাফ আলী ও আকবর আলী) লালন-পালন করেন। শৈশব থেকেই হযরত থানভীর মাঝে এক গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও গাম্ভীর্য প্রকাশ পেয়েছিল। সমবয়সী শিশুরা যখন খেলাধুলায় মগ্ন থাকত, তিনি তখন একাকী বসে ইবাদত বা চিন্তাভাবনা করতে পছন্দ করতেন। জানা যায়, শৈশবেই তিনি একাকী দাঁড়িয়ে খুতবা দেওয়ার ও নামাজ পড়ানোর অভিনয় করতেন, যা তাঁর ভবিষ্যৎ মহান জীবনেরই ইঙ্গিত বহন করত।

২. শিক্ষা জীবন ও মেধার স্ফুরণ

প্রাথমিক শিক্ষা:

হযরত থানভী (রহ.)-এর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় নিজ জন্মভূমি থানা ভবনেই। তিনি অত্যন্ত অল্প বয়সে পরম শ্রদ্ধেয় হাফেজ গোলাম মোর্তজা সাহেবের নিকট পবিত্র কুরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। কুরআন মুখস্থ করার পর তিনি মাওলানা ফতেহ মুহাম্মদ সাহেবের অধীনে আরবি ও পারসি ভাষার প্রাথমিক ব্যাকরণ, সাহিত্য ও প্রাথমিক কিতাবসমূহ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সমাপ্ত করেন।

দারুল উলুম দেওবنده উচ্চশিক্ষা:

১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি তদানীন্তন ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামি শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’-এ উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। দেওবন্দে তাঁর আগমন ছিল এই বিদ্যাপীঠের ইতিহাসের অন্যতম এক গৌরবময় অধ্যায়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। সাধারণ ছাত্ররা যে কিতাব বুঝতে হিমশিম খেত, তিনি তা অনায়াসে আয়ত্ত করে ফেলতেন। তাঁর অনন্য মেধা, কঠোর অধ্যবসায় এবং উস্তাদদের প্রতি গভীর ভক্তির কারণে তিনি মাত্র ৫ বছরের সংক্ষিপ্ত সময়ে (১২৯৯ হিজরিতে) দাওরায়ে হাদিসসহ (তৎকালীন দরসে নিজামির সর্বোচ্চ ডিগ্রি) ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞানের সমস্ত শাখা কৃতিত্বের সাথে সম্পন্ন করেন।

তাঁর বিশ্ববরেণ্য শিক্ষকগণ:

দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি সমকালের শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বখ্যাত আলেমদের সরাসরি ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন:

  • মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব নানুতুবী (রহ.): যিনি ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম প্রধান শিক্ষক (সদরে মুদাররিস) এবং হযরত থানভীর চিন্তাগত ও আধ্যাত্মিক গঠনে সবচেয়ে বড় পথপ্রদর্শক।
  • শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দি (রহ.): যিনি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা এবং বিশ্ববিখ্যাত হাদিস বিশারদ।
  • মাওলানা আহমদ আলী সাহারানপুরী (রহ.): প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ এবং বুখারি শরীফের অন্যতম ব্যাখ্যাকার।

দেওবন্দের সমাপনী পরীক্ষায় তিনি এত চমৎকার ফলাফল করেছিলেন যে, দস্তারে ফযীলত (পাগড়ি প্রদান) অনুষ্ঠানে তাঁর উস্তাদ মাওলানা ইয়াকুব নানুতুবী (রহ.) অত্যন্ত গর্ব করে বলেছিলেন, “আশরাফ আলী কেবল কিতাবই পড়েনি, সে ইলমকে হজম করেছে।”

৩. আধ্যাত্মিক সাধনা ও খেলাফত লাভ

ইসলামের বাহ্যিক জ্ঞান (ইলমে জাহির) অর্জনের পর হযরত থানভী (রহ.)-এর অন্তরে আত্মিক পরিশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক মারেফাত (ইলমে বাতিন) অর্জনের তীব্র ব্যাকুলতা তৈরি হয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল কিতাব খোলার মাধ্যমে অন্তরের ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়; এর জন্য একজন যোগ্য আধ্যাত্মিক গুরুর (পীর) তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।

হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর সান্নিধ্যে:

তিনি তাঁর উস্তাদদের পরামর্শে তৎকালীন উপমহাদেশের সুফি সম্রাট এবং আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.)-এর নিকট বায়াত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হাজী সাহেব তখন মক্কায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন। হযরত থানভী (রহ.) মক্কাতুল মোকাররমায় গিয়ে তাঁর পীরের পবিত্র সান্নিধ্যে অবস্থান শুরু করেন।

খেলাফত লাভ:

খানকাহে ইমদাদিয়ায় অবস্থানকালে তরুণ আশরাফ আলীর ভেতরের আত্মিক যোগ্যতা, বিনয় এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা দেখে পীর হাজী ইমদাদুল্লাহ (রহ.) বিস্মিত হন। সাধারণত তাসাউফের ময়দানে খেলাফত বা পীর হওয়ার অনুমতি পেতে দীর্ঘ বছরের সাধনার প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাজী সাহেব হযরত থানভীর অনন্য প্রতিভা দেখে অতি অল্প দিনেই তাঁকে চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দিয়া—এই চার প্রধান তরিকার ‘খেলাফত’ ও এজাজত প্রদান করেন। হাজী সাহেব তাঁর ডায়েরিতে লিখেছিলেন: “আশরাফ আলী ভারতের মুসলমানদের জন্য আল্লাহর এক বিশেষ নেয়ামত।”

৪. সুদীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় কর্মজীবন

হযরত থানভী (রহ.)-এর কর্মজীবনকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রথমটি কানপুরের শিক্ষকতার জীবন এবং দ্বিতীয়টি থানা ভবনের খানকাহ ও সংস্কারমূলক জীবন।

ক. কানপুরের শিক্ষকতা জীবন (১৮৮৩ – ১৮৯৭ খ্রি.):

শিক্ষা জীবন শেষ করে ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ভারতের কানপুর শহরের বিখ্যাত ‘মাদরাসা ফয়জে আম’-এ প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি টানা চৌদ্দ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে শিক্ষকতা ও ফতোয়া প্রদানের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাঁর পাঠদানের অনন্য পদ্ধতির কারণে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা কানপুরে ছুটে আসত। কানপুরে থাকাকালীন তিনি সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য প্রচুর ওয়াজ ও জনসভা করতেন। তাঁর আলোচনা শোনার জন্য হাজার হাজার মানুষের সমাগম হতো।

খ. থানা ভবনে প্রত্যাবর্তন ও খানকাহ পরিচালনা (১৮৯৭ – ১৯৪৩ খ্রি.):

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর আধ্যাত্মিক মুর্শিদ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (রহ.) মক্কা থেকে চিঠি লিখে তাঁকে নির্দেশ দেন যে, কানপুরের মাদরাসার কাজ পরিচালনা করার মতো অনেক আলেম আছেন, কিন্তু তাঁর আসল কাজ হলো মুসলিম উম্মাহর আত্মিক সংশোধন ও সংস্কার করা। পীরের নির্দেশ পাওয়া মাত্রই তিনি কানপুরের সুপ্রতিষ্ঠিত মোহ ও সুনাম ত্যাগ করে নিজ জন্মভূমি ‘থানা ভবন’-এ ফিরে আসেন।

থানা ভবনে এসে তিনি তাঁর পীরের স্মৃতিবিজড়িত ‘খানকাহ-এ ইমদাদিয়া’ নতুন করে প্রাণবন্ত করে তোলেন। জীবনের শেষ ৪৬ বছর তিনি এই খানকাহেই অবস্থান করেন। এই খানকাহটি কোনো প্রথাগত পীরের আস্তানা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি আধ্যাত্মিক হসপিটাল। প্রতিদিন শত শত মানুষ তাদের অন্তরের অহংকার, হিংসা, রিয়া বা লোকদেখানো মানসিকতা এবং আত্মিক রোগ নিরাময়ের জন্য চিঠির মাধ্যমে বা সশরীরে এসে হযরত থানভীর প্রেসক্রিপশন বা পরামর্শ নিতেন।

৫. ইসলামে অনন্য কৃতিত্ব ও সংস্কারমূলক অবদান (মুজাদ্দিদানা অবদান)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-কে বিংশ শতাব্দীর ‘মুজাদ্দিদ’ বা সংস্কারক বলা হয়। কারণ তিনি ইসলামের মূল চেতনাকে সমকালীন যুগের চাহিদার আলোকে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর প্রধান অবদানসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:

১. খানকাহ ও তাসাউফ ব্যবস্থার বিশুদ্ধিকরণ:

তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে পীর-মুরিদী বা সুফিবাদ চরম কুসংস্কার ও বিদআতে রূপ নিয়েছিল। কবর পূজা, পীরের সামনে সেজদা করা, গান-বাজনা (কাওয়ালী) এবং শরিয়তহীন জীবনকে তরীকত বলে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। হযরত থানভী (রহ.) কঠোর হস্তে এর সংস্কার করেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, “শরিয়ত ব্যতীত কোনো তরিকত হতে পারে না।” তিনি সুফি সাধনাকে সম্পূর্ণভাবে সুন্নাহ এবং ফিকহের অধীন নিয়ে আসেন।

২. আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতিতে আত্মশুদ্ধি:

তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব (Psychology) খুব ভালো বুঝতেন। কোনো মুরিদ তার আত্মিক সমস্যার কথা জানালে তিনি অত্যন্ত আধুনিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপায়ে তার সমাধান দিতেন। তিনি মুরিদদের কঠোর উপবাস বা কঠিন সাধনার পরিবর্তে দৈনন্দিন জীবনে সুন্নাহর নিয়মিত অনুশীলনের ওপর জোর দিতেন।

৩. নারী অধিকার ও নারী শিক্ষার উন্নয়ন:

তৎকালীন সমাজে মুসলিম নারীরা দ্বীনি শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিল এবং তাদের ওপর নানা সামাজিক অবিচার করা হতো। হযরত থানভী (রহ.) নারীদের অধিকার, তাদের ঘরের ভেতরের দ্বীনি পরিবেশ তৈরি এবং তাদের শিক্ষার জন্য এক বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি নারীদের সহজ ভাষায় ইসলামি আইন ও নৈতিকতা শেখানোর জন্য কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেন।

৪. রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও পাকিস্তান আন্দোলন:

যদিও হযরত থানভী (রহ.) সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের পদে ছিলেন না, তবে তৎকালীন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এবং মুসলমানদের পৃথক আবাসভূমি (পাকিস্তান) প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁর পরোক্ষ ভূমিকা ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। ব্রিটিশদের গোলামি থেকে মুসলমানদের মুক্ত করতে এবং ভারতের হিন্দুদের আধিপত্য থেকে মুসলিম সংস্কৃতিকে বাঁচাতে তিনি ‘দ্বি-জাতি তত্ত্ব’ এবং পাকিস্তান আন্দোলনের তাত্ত্বিক সমর্থন দেন।

তৎকালীন মুসলিম লীগের নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাঁর কাছে পরামর্শের জন্য প্রতিনিধি দল পাঠাতেন। হযরত থানভীর নির্দেশে তাঁর প্রধান দুই খলিফা—আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানি (রহ.) এবং মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং এই নতুন রাষ্ট্রের ইসলামি রূপরেখা তৈরিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।

৬. লিখনী ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম

হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর লিখনী শক্তি ছিল মহান আল্লাহর এক বিশেষ অলৌকিক নিদর্শন (কারামত)। তিনি একাধারে উর্দু, আরবি ও ফারসি ভাষায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১,০০০ (এক হাজার) কিতাব ও পুস্তিকা রচনা করেছেন। ইসলামি সাহিত্যের ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক তথ্যবহুল ও সংস্কারমূলক কিতাব লেখার নজির বিরল। নিচে তাঁর প্রধান কয়েকটি কালজয়ী গ্রন্থের পরিচয় দেওয়া হলো:

১. তাফসির ‘বায়ানুল কুরআন’ (بیان القرآن):

উর্দু ভাষায় রচিত এটি হযরত থানভীর এক অনন্য ও যুগান্তকারী তাফসির গ্রন্থ। এই তাফসিরের বিশেষত্ব হলো, এটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ। তিনি আল কুরআনের আয়াতের শাব্দিক অনুবাদের পাশাপাশি সূক্ষ্ম ফিকহি ও আধ্যাত্মিক রহস্যগুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উপমহাদেশের আলেম সমাজ ও গবেষকদের কাছে এটি একটি অপরিহার্য আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

২. ‘বেহেশতী জেওর’ (بہشتی زیور):

এটি তাঁর জীবনের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বহুল পঠিত একটি কিতাব। মুসলিম নারীদের আকীদা, ফিকহ, দৈনন্দিন জীবন ব্যবস্থা, গৃহস্থালি পরিচালনা, চিকিৎসা এবং চরিত্র গঠনের এক পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ (Encyclopedia) হলো এই গ্রন্থটি। একটা সময় উপমহাদেশে এমন কোনো মুসলিম ঘর ছিল না যেখানে ‘বেহেশতী জেওর’ কিতাবটি ছিল না। নতুন কনের বিয়ের যৌতুক বা উপহার হিসেবে এই কিতাবটি দেওয়া বাধ্যতামূলক রেওয়াজে পরিণত হয়েছিল।

৩. ‘তরবিয়াতুস সালিক’ (تربیت السالک):

তাসাউফ বা আত্মশুদ্ধির জগতে এটি একটি মাইলফলক গ্রন্থ। দেশ-বিদেশ থেকে আধ্যাত্মিক পথের পথিক বা মুরিদরা তাঁদের আত্মিক সমস্যার কথা জানিয়ে হযরত থানভীকে যে চিঠি লিখতেন, এবং হযরত থানভী তার যে চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক সমাধান ও জবাব দিতেন—সেসব চিঠিপত্রের এক বিশাল সংকলন এটি।

৪. ‘তুহফাতুজ জাওজাইন’ (تحفة الزوجین):

দাম্পত্য জীবনকে কীভাবে সুখী, শান্তিময় এবং সুন্নাহসম্মত করা যায়, স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য কী—সে বিষয়ে একটি চমৎকার ও বাস্তবমুখী গাইডলাইন।

৫. ‘মুনাজাতে মকবুল’ (مناجات مقبول):

পবিত্র কুরআন এবং বিশুদ্ধ হাদিসসমূহে বর্ণিত আল্লাহর দরবারে ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনার দোয়াসমূহের একটি সাপ্তাহিক চমৎকার সংকলন। সাধারণ মুসলমানদের প্রতিদিন পাঠ করার জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

৬. ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ (امداد الفتاوی):

এটি তাঁর গভীর ফিকহি প্রজ্ঞার এক বিশাল প্রমাণ। বহুখণ্ডে বিভক্ত এই ফতোয়া গ্রন্থে তিনি সমকালীন ও আধুনিক যুগের জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সমস্যার নিখুঁত শরয়ী সমাধান পেশ করেছেন।

৭. ইন্তেকাল, দাফন ও বর্তমান প্রভাব

ইন্তেকাল:

সুদীর্ঘকাল ধরে দ্বীনের আলো ছড়ানোর পর, এই মহান সংস্কারক ও আল্লাহর অলি ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুলাই (১৩hex৬২ হিজরির ১৬ রজব) সোমবার রাতে ৮০ বছর বয়সে ভারতের উত্তর প্রদেশের থানা ভবনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের সংবাদে পুরো উপমহাদেশ জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।

জানাজা ও দাফন:

তাঁর জানাজার নামাজে সমকালীন শ্রেষ্ঠ উলামা, মাশায়েখ এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সমাগম ঘটে। তাঁরই অসিয়ত ও নির্দেশ অনুযায়ী, থানা ভবনের ‘ইশআতুল উলুম’ মাদরাসার সংলগ্ন কবরস্থানে (যা বর্তমানে ‘মাকবারায়ে ইমদাদিয়া’ নামে পরিচিত) তাঁকে অত্যন্ত সাদাসিধেভাবে দাফন করা হয়।

বর্তমান অবস্থা ও উত্তরাধিকার (Legacy)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, চিন্তাধারা এবং ইলমি উত্তরাধিকার আজ বিশ্বজুড়ে জীবন্ত।

                  হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)
                                  │
         ┌────────────────────────┴────────────────────────┐
         ▼                                                 ▼
আধ্যাত্মিক ও ফিকহি উত্তরাধিকার                  কালজয়ী সাহিত্য ও শিক্ষা
(বিশ্বজুড়ে হাজারো মাদরাসা ও খানকাহ)            (বায়ানুল কুরআন, বেহেশতী জেওর)
  • তাঁর খলিফাগণের অবদান: হযরত থানভী (রহ.) তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় শতাধিক যোগ্য ব্যক্তিকে আধ্যাত্মিক খেলাফত প্রদান করেছিলেন। তাঁর এই খলিফাগণই পরবর্তীকালে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশে ইসলামি শিক্ষার মূল ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) (দারুল উলুম করাচির প্রতিষ্ঠাতা), আল্লামা ক্বারী তৈয়ব (রহ.) (দারুল উলুম দেওবন্দের দীর্ঘকালীন মুহতামিম), এবং বাংলাদেশের মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), হযরত হাফেজ্জী হুজুর (রহ.) ও মাওলানা আতহার আলী (রহ.) অন্যতম। বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা ও ইসলামি ভাবধারার পেছনে হযরত থানভীর খলিফাদের অবদান অনস্বীকার্য।
  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খানকাহ: বর্তমানে ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে হযরত থানভী (রহ.)-এর চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে শত শত মাদরাসা ও আত্মশুদ্ধির খানকাহ পরিচালিত হচ্ছে।
  • সাহিত্যের বৈশ্বিক সমাদর: তাঁর রচিত ‘বেহেশতী জেওর’, ‘বায়ানুল কুরআন’ এবং অন্যান্য কিতাবসমূহ ইংরেজি, বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, পশতু এবং ফারসিসহ পৃথিবীর প্রধান প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়ে আজও কোটি কোটি মানুষের ঘরে ঘরে পঠিত হচ্ছে এবং হেদায়েতের আলো ছড়াচ্ছে।

উপসংহার

হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ছিলেন একবিংশ শতাব্দীর মুসলমানদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তিনি ইসলামকে কোনো কঠিন বা অবাস্তব ধর্ম হিসেবে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনে সহজে পালনযোগ্য একটি সুন্দর জীবনব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে গেছেন। সমাজ সংস্কার, মনস্তাত্ত্বিক আত্মশুদ্ধি এবং ইসলামি সাহিত্যের প্রসারে তাঁর এই মুজাদ্দিদানা অবদান কেয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। আল্লাহ তাআলা এই মহান মনিষীকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু কিতাবের লিংক :

০১.আদাবুল মুআশারাত

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০২.আমলে কোরআনী

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৩. আশরাফুল জওয়াব

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৪. ইছলাহুন নিসওয়ান

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৫. ইসলাহী নেসাব

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৬. ইছলাহুন মুসলিমীন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৭. জাযাউল আমাল বা আমলের প্রতিদান

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৮. কুসংস্কার সংশোধন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



০৯. তকদীর কি

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১০. তরবিয়তে আওলাদ বা সন্তান প্রতিপালন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১১. তারবিয়াতুস সালিক

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১২. নেক আমল

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৩. পারিবারিক জীবন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৪. বেহশতী গাওহার

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৫. মাজালিসে হাকীমুল উম্মত

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৬. ইসলাহুন নিসওয়ান বা মাতৃজাতির সংশোধন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৭. মারেফাতের মর্মকথা

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৮. মিরাজ ও বিজ্ঞান

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



১৯. মুমিন ও মুনাফিক

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২০. মুসলমানের হাসি

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২১. মুসলিম বর কণে

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২২. যে ফুলের খুশবতে সারা জাহান মাতোয়ারা

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২৩. শওকে ওয়াতান

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২৪. শরীয়তের দৃষ্টিতে পর্দার হুকুম

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



২৬. হুকুকুল ইসলাম ও হুকুকুল ওয়ালিদাইন

লেখক : আশরাফ আলী থানভী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"