মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক

শাইখুল হাদিস মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক (দা.বা.) সমকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ (মুহাদ্দিস), প্রখ্যাত ফকিহ (ইসলামী আইনবিদ), বহুমাত্রিক গবেষক এবং ইসলামি বুদ্ধিজীবী। তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশে ইলমে হাদীসের উচ্চতর গবেষণা, তাহকীক (বিশুদ্ধতা যাচাই) এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছেন। তিনি রাজধানী ঢাকার বিখ্যাত উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা’-এর প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষা পরিচালক ও বর্তমান আমীনুত তালীম (প্রধান পরিচালক)। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব। এই মহান যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীর জীবন ও কর্মের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩৮৯ হিজরি) বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা মুহাম্মদ শামসুল হক (রহ.) ছিলেন একজন অত্যন্ত পরহেযগার এবং নিষ্ঠাবান আলেম। পারিবারিক সুবাদে শৈশব থেকেই তিনি একটি চমৎকার দ্বীনি ও ইলমি পরিবেশে লালিত-পালিত হন, যা তাঁর ভবিষ্যৎ মহান জ্ঞান সাধনার পথ সুগম করে দিয়েছিল।

২. শিক্ষাজীবন ও মেধার অলৌকিক স্ফুরণ

তাঁর শিক্ষাজীবন সমকালীন বিশ্বের জ্ঞানপিপাসু আলেমদের জন্য এক পরম অনুকরণীয় আদর্শ। দেশ ও বিদেশের শীর্ষস্থানীয় বিদ্যাপীঠসমূহে তিনি অত্যন্ত মেধার সাথে শিক্ষা সমাপন করেন।

ক. দেশীয় শিক্ষাজীবন:

তিনি চাঁদপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন মাদরাসায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন। এরপর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘জামিআ শরইয়্যাহ মালিবাগ’ থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষায় অসাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।

খ. করাচিতে উচ্চতর ফিকহ ও ফতোয়া (ইফতা):

মাদরাসার সাধারণ পাঠ্যক্রম শেষ করে উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে তিনি পাকিস্তানের করাচিতে গমন করেন। সেখানে বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ‘জামিআ দারুল উলুম করাচি’-তে ভর্তি হন। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ জাস্টিস আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানী (দা.বা.) এবং পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ রফি উসমানী (রহ.)-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে তিনি তিন বছর গভীর ফিকহ ও ফতোয়া শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর গবেষণা (তাকাসসুস ফিল ইফতা) সম্পন্ন করেন।

গ. রিয়াদে হাদিস শাস্ত্রের উচ্চতর গবেষণা:

ফিকহ শাস্ত্রের পর তাঁর অন্তরে ইলমে হাদীসের গভীর গবেষণার তীব্র আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়। এজন্য তিনি সৌদি আরবের রিয়াদে গমন করেন। সেখানে তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীস গবেষক ও যুগশ্রেষ্ঠ আলিম শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ.)-এর ব্যক্তিগত সান্নিধ্যে দীর্ঘ তিন বছর অবস্থান করেন। সেখানে তিনি উলুমুল হাদীস (হাদীসের তত্ত্ব ও ইতিহাস), হাদীসের সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং পাণ্ডুলিপি তাহকীকের গভীরতম পাঠ গ্রহণ করেন। শায়খ আবু গুদ্দাহ (রহ.) তাঁর এই বাঙালি ছাত্রের মেধা ও নিষ্ঠা দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হয়েছিলেন।

৩. সুদীর্ঘ কর্মজীবন ও শিক্ষকতা

শিক্ষা জীবন সমাপ্ত করে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ইলমি খিদমতে আত্মনিয়োগ করেন।

ক. মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা প্রতিষ্ঠা:

২০০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দেশের কয়েকজন বরেণ্য আলেমের সাথে মিলে ঢাকার হযরতপুর, কেরানীগঞ্জে (অফিস: পল্লবী, মিরপুর) উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি মূলত দাওরায়ে হাদিস পাস করা মেধাবী আলেমদের হাদীস, ফিকহ ও দাওয়াহর ওপর উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের একটি আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান। শুরু থেকেই তিনি এর শিক্ষা পরিচালক (আমীনুত তালীম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কঠোর মেহনতে এই প্রতিষ্ঠানটি আজ পুরো উপমহাদেশে হাদীস গবেষণার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

খ. মাসিক আল-কাউসার সম্পাদনা:

সাধারণ মানুষ এবং আলেম সমাজের চিন্তাগত পরিশুদ্ধির জন্য মারকাযুদ দাওয়াহ থেকে তাঁরই তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত হয় উচ্চমানের গবেষণামূলক পত্রিকা ‘মাসিক আল-কাউসার’। এর মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামি গবেষণাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

গ. জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব:

২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ সরকার মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেককে দেশের জাতীয় মসজিদ ‘বায়তুল মোকাররম’-এর খতিব হিসেবে নিযুক্ত করে। তাঁর খুতবা ও গভীর ইলমি আলোচনা শোনার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষ ও আলেম সমাজ ছুটে আসতেন। (পরবর্তীতে তিনি শারীরিক অসুস্থতা ও গবেষণার কাজের চাপের কারণে এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন)।

৪. ইসলামে অনন্য কৃতিত্ব ও আন্তর্জাতিক অবদান

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিকভাবে একজন স্বীকৃত গবেষক।

  • হাদীস শাস্ত্রের তাহকীক: সমাজে প্রচলিত জাল (বানোয়াট) এবং যঈফ (দুর্বল) হাদীসের ভিড়ে সহীহ হাদীসের সমঝ ও প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি এক বৈপ্লবিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ওপর তিনি জোর দেন।
  • সরাসরি সনদের ধারা সচল রাখা: তিনি বিশ্বের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসদের কাছ থেকে সরাসরি হাদীস বর্ণনার উচ্চতর ‘ইজাজত’ বা সনদ লাভ করেছেন, যা তিনি তাঁর যোগ্য ছাত্রদের প্রদান করার মাধ্যমে হাদীসের ঐতিহ্যবাহী ধারাকে টিকিয়ে রাখছেন।
  • ইসলামিক ফিন্যান্স: ইসলামিক ব্যাংকিং ও অর্থায়নের বিভিন্ন শরিয়াহ বোর্ডে তিনি একজন নির্ভরযোগ্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন।

৫. লিখনী ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম

উর্দু, আরবি ও বাংলা ভাষায় তাঁর লিখিত গ্রন্থ ও গবেষণাপত্রসমূহ আলেম সমাজের কাছে ‘দলিল’ হিসেবে গণ্য হয়। তাঁর লেখার ভাষা অত্যন্ত গম্ভীর, তথ্যবহুল এবং আবেগবর্জিত খাঁটি গবেষণামূলক। তাঁর বিখ্যাত কিছু কিতাব হলো:

১. আল-মাদখাল ইলা উলুমিল হাদিসিন নববী (المدخل إلى علوم الحديث النبوي): হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষার ওপর আরবি ভাষায় রচিত তাঁর এটি একটি মাস্টারপিস গ্রন্থ, যা বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের বহু উচ্চতর মাদরাসার পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত।

২. উম্মাহর ঐক্য: পথ ও পন্থা: মুসলিম উম্মাহর ভেতরের ছোটখাটো ইখতিলাফ বা মতবিরোধ দূর করে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকা যায়, সে বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে লিখিত একটি যুগান্তকারী বই।

3. প্রচলিত ভুল: মুসলিম সমাজে হাদীস, আমল এবং আকিদার নামে যেসব ভুল ও কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে, দলিলভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো চিহ্নিত করে লিখিত অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি গ্রন্থ।

৪. ঈমান সবার আগে: মুসলমানদের আকিদা ও বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়গুলোর সহজ ও সাবলীল উপস্থাপনা।

৫. তাসাউফ: তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ: আত্মশুদ্ধি বা পীর-মুরিদী নিয়ে সমাজে প্রচলিত চরমপন্থা ও অবহেলার মাঝখানে সুন্নাহসম্মত মধ্যপন্থা কী, তা এতে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

৬. বর্তমান অবস্থা (২০২৬)

বর্তমান ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক (দা.বা.) প্রাজ্ঞ বয়সে উপনীত হয়ে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা-এর প্রধান অভিভাবক হিসেবে অবস্থান করছেন।

  • ইলমি মুরুব্বী: বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এবং আল-হাইআতুল উলয়া-এর বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ফোরামে হাদীস ও ফিকহ বিষয়ের প্রধান বিশেষজ্ঞ ও মুরুব্বী হিসেবে ভূমিকা রাখছেন।
  • গবেষণা ও নিভৃতচারিতা: তিনি প্রচারবিমুখ এবং নিভৃতচারী আলেম হিসেবে পরিচিত। বড় কোনো রাজনৈতিক পদ বা কোলাহল থেকে দূরে থেকে তিনি দিনরাত কেবল কিতাবের রাজত্বে ডুবে থাকেন। দেশের তরুণ আলেম ও গবেষক সমাজের কাছে তিনি এক জীবন্ত প্রেরণার উৎস।

উপসংহার

মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক (দা.বা.) হলেন সমকালীন বাংলাদেশের ইসলামি জ্ঞানজগতের অহংকার। আবেগ ও অন্ধবিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে খাঁটি দলিল, যুক্তি এবং সালাফদের (পূর্বসূরিদের) অনুসৃত পথের আলোকে দ্বীনকে বোঝার যে ধারা তিনি বাংলাদেশে তৈরি করেছেন, তা অনাগত বহু প্রজন্মকে সঠিক পথ দেখাবে। আল্লাহ তাআলা এই মহান মনিষীকে পূর্ণ সুস্থতার সাথে দীর্ঘজীবী করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু কিতাব :

০১. ঈমান সবার আগে

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০২. উম্মাহর ঐক্য পথ ও পন্থা

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৩. এসব হাদীস নয় ১ম খণ্ড

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৪. এসব হাদীস নয় ২য় খণ্ড

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৫. তাবলীগ জামাত বর্তমান পরিস্থিতি ও উত্তরণের উপায়

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৬. তালিবানে ইলম পথ ও পাথেয়

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৭. নবীজির নামাজ

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৮. নবীজীর ﷺ মেরাজ

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



০৯. নির্বাচিত প্রবন্ধ ১ম খণ্ড

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



১০. নির্বাচিত প্রবন্ধ ২য় খণ্ড

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



১১. প্রচলিত জাল হাদীস

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



১২. প্রচলিত ভুল

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



১৩. হাদীস ও সুন্নাহয় কাবলাল জুমা

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



১৪. হাদীস ও সুন্নাহয় নামাযের পদ্ধতি

লেখক : মুফতি আব্দুল মালেক



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"