মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি

মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি বাংলাদেশের সমকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত একটি চরিত্র। বিশেষ করে বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনে তার নাম বারবার উঠে এসেছে।

১. জন্ম, পারিবারিক পটভূমি ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবন

মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা বরগুনায় একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী ছিলেন। তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় স্থানীয় মক্তব ও মাদরাসায়।

পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারায় যুক্ত হন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি মাদরাসা থেকে তিনি অত্যন্ত সুনামের সাথে সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষা তথা ‘দাওরায়ে হাদিস’ (যা সাধারণ শিক্ষার মাস্টার্স সমমান) সম্পন্ন করেন। কওমি ধারার শিক্ষাজীবনে তিনি কুরআন, হাদিস, আরবি সাহিত্য এবং ইসলামিক আইনের ওপর গভীর বুৎপত্তি অর্জন করেন।

২. উচ্চতর শিক্ষা ও ‘মুফতি’ পদবি লাভ

বাংলাদেশে প্রাথমিক ও উচ্চতর শিক্ষা শেষ করার পর তিনি ইসলামের গভীর ও জটিল আইনি ব্যাখ্যা (Jurisprudence) বা ফিকহ শাস্ত্রের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি ভারত ও পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গমন করেন।

  • দারুল উলুম দেওবন্দ (ভারত): উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি ফিকহ শাস্ত্রের ওপর গুরুত্বপূর্ণ পাঠ গ্রহণ করেন।
  • পাকিস্তানের উচ্চতর প্রতিষ্ঠান: পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের করাচিসহ বিভিন্ন বড় বড় ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে ‘ইফতা’ বা ফতোয়া প্রদানের উচ্চতর কোর্স সম্পন্ন করেন।

এই দীর্ঘ এবং কঠোর একাডেমিক প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করার পরই তিনি ইসলামিক আইনের একজন বিশেষজ্ঞ বা ‘মুফতি’ হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং তার নামের সাথে এই পদবিটি যুক্ত হয়।

৩. কর্মজীবন, দাওয়াতী কার্যক্রম ও প্রচার কৌশল

বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বাংলাদেশে ফেরার পর মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি রাজধানী ঢাকাকে তার কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অবিকল ঐতিহ্যবাহী ধারায় একটি মসজিদ ও মাদরাসা (মারকাজ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানে খতিব ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন।

আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার:

সে সময় প্রচলিত ধারার অনেক আলেম যখন প্রযুক্তি থেকে দূরে ছিলেন, তখন মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি তার দাওয়াতী কার্যক্রমকে ছড়িয়ে দিতে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেন।

  • ইন্টারনেট ও ওয়েবসাইট: তিনি নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তার বয়ান ও ফতোয়া প্রচার করতে থাকেন।
  • সোশ্যাল মিডিয়া ও সিডি (CD): অডিও-ভিডিও সিডি এবং প্রাথমিক যুগের সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তার বক্তব্য দ্রুত দেশের তরুণদের একটি অংশের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু:

তার খুতবা এবং আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর সংকট, সমকালীন ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা, ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামিক আদর্শের পুনর্জাগরণ। তার স্পষ্ট ও আপসহীন বাচনভঙ্গির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি বিপুল সংখ্যক তরুণের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

৪. বিতর্ক, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ এবং উগ্রবাদের অভিযোগের নেপথ্য কাহিনী

২০১২ এবং ২০১৩ সালের দিকে বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন মুক্তমনা লেখক ও ব্লগারের ওপর ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটে। তৎকালীন সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করে যে, এই হামলাগুলোর পেছনে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ (ABT) নামক একটি গোপন উগ্রপন্থী সংগঠন জড়িত এবং মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি হলেন এর প্রধান বা আধ্যাত্মিক নেতা।

তবে পরবর্তী সময়ে এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও ভিন্ন সত্য উন্মোচিত হয়:

মিডিয়া ট্রায়াল ও সাজানো নাটক:

মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানির পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন স্বাধীন বিশ্লেষকদের মতে, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামক সংগঠনের সাথে তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সাংগঠনিক যোগাযোগ ছিল না। তৎকালীন সরকার নিজেদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য মিডিয়াকে ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম ‘জঙ্গি নাটক’ সাজায়। সাধারণ মানুষের কাছে তাকে একজন উগ্রবাদী হিসেবে উপস্থাপন করতে গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে একপাক্ষিক প্রচারণা চালানো হয়।

কারাগারের ভেতর থেকে সত্য প্রকাশ:

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি যখন কারাগারে বন্দি ছিলেন, তখন তিনি জানতেনই না যে তাকে একটি সুনির্দিষ্ট নিষিদ্ধ সংগঠনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা প্রতিষ্ঠাতা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদালতে যখন চার্জশিট দাখিল করা হয় এবং মিডিয়ার নথিপত্র তার সামনে আসে, তখন তিনি প্রথম জানতে পারেন যে রাষ্ট্র ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তার নামে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ নামক একটি কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত অধ্যায় তৈরি করেছে।

ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যাকাণ্ড:

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন তদন্তকারী সংস্থাগুলো দাবি করে যে, মুফতি জসিম উদ্দিনের মোহাম্মদপুরের মারকাজে আসা কিছু তরুণ তার খুতবায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তবে জসিম উদ্দিনের আইনজীবীদের মতে, গ্রেফতারকৃত তরুণদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে আদালতে জোরপূর্বক জবানবন্দী আদায় করা হয়েছিল, যাতে মুফতি জসিম উদ্দিনের নাম ইচ্ছা করে জড়ানো যায়।

৫. গ্রেফতার, দীর্ঘ কারাজীবন ও আইনি লড়াই

২০১৩ সালের আগস্ট মাসে মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানিকে তার নিজ জেলা বরগুনা থেকে কয়েকজন সহযোগীসহ গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর তার ওপর নেমে আসে দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের কারাজীবন।

  • ২০১৫ সালের রায়: ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ব্লগার রাজীব হায়দার হত্যা মামলায় তাকে সরাসরি পরিকল্পনাকারী না পেলেও, ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে।
  • অন্যান্য মামলার বেড়াজাল: রাজীব হায়দার হত্যা মামলার ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি মুক্তি পাননি। তৎকালীন সরকার তার মুক্তি ঠেকাতে একের পর এক সন্ত্রাসবিরোধী আইন, উগ্রবাদী তৎপরতা এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে নতুন নতুন মামলা দায়ের করে। ফলে বছরের পর বছর তাকে জামিন না দিয়ে কারাগারে বন্দি রাখা হয়।

৬. সাম্প্রতিক অবস্থা ও মুক্তি (২০২৪-২০২৬)

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বাংলাদেশে একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরপরই দেশের বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা শুরু হয়।

জামিনে মুক্তি:

দীর্ঘ ১১ বছর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টিত কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকার পর, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের শেষের দিকে মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি সবকটি মামলায় জামিন পেয়ে কারামুক্ত হন। তার এই মুক্তি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বর্তমান পরিস্থিতি:

২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি কারাগারের বাইরে থাকলেও সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। দীর্ঘ কারাবাসের কারণে তার স্বাস্থ্যের যেমন অবনতি হয়েছে, তেমনি তাকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সতর্কতা এখনো বিদ্যমান।

বর্তমান অবস্থান: তিনি বর্তমানে রাজনৈতিক বা উগ্র কোনো কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকে শান্ত ও ধর্মীয় জীবনযাপনের চেষ্টা করছেন বলে জানা যায়। তবে বিগত এক দশকে তার ওপর যে ‘জঙ্গি’ তকমা সাঁটা হয়েছিল, তা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল—এই সত্যটি এখন বাংলাদেশের সমকালীন ইতিহাসে একটি অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গোয়েন্দা নজরদারি: বিভিন্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সংবাদ মাধ্যমের সূত্রানুসারে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সমীকরণের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এখনো তার কর্মকাণ্ড ও যাতায়াতের ওপর সুনির্দিষ্ট নজরদারি বজায় রেখেছে।

তার লেখা কিছু বইয়ের লিংক :



০১. আল্লাহর রাসূল সা. কে নিয়ে কটুক্তি কারীর সম্পর্কে শরীয়তের বিধান

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০২. ইসলাম শ্রমিকের অধিকার

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৩. ঈমান ধ্বংশকারী আমল ও মুসলিম আকিদা

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৪. উম্মুক্ত তরবারী

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৫. কাফির ও কুফর

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৬. কিতাবুজ জাকাত

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৭. কিতাবুত তাওহীদ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৮. কিতাবুদ দাওয়াহ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



০৯. কিতাবুল আক্বাইদ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১০. কিতাবুল ঈমান

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১১. কিতাবুল হজ্জ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১২. কিতাবুস সাওম

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৩. কুরআন সুন্নাহকে আকড়ে ধর

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৪. তাওহীদের সঠিক জ্ঞান অর্জন ও সকল ক্ষেত্র তাওহীদ প্রয়োগ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৫. তাজকিয়াতুল নুফূজ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৬. দ্বীন কায়েমের সঠিক পথ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৭. পীদের ভ্রান্ত আকিদা

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৮. বাইআত ও সিরাতে মুস্তাকীম

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



১৯. মুসলিম যুবদের প্রতি বার্তা

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



২০. শবে বরাত

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



২১. সিয়াম ও ঈদ

লেখক : মুফতি জসিম উদ্দিন রহমানি



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"