বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে, বিশেষ করে শিশুসাহিত্যে এক উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় নক্ষত্র হলেন হেলেনা খান। গল্পকার, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক এবং প্রাবন্ধিক—সাহিত্যের বহু শাখায় তিনি তাঁর প্রতিভার সাক্ষ্য রেখে গেছেন। শিক্ষাবিদ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে পরবর্তীকালে সাহিত্য সৃষ্টিতে নিজেকে নিমগ্ন করেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে যেসব নারী লেখক বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে হেলেনা খান অন্যতম। সহজ-সরল ভাষা, শিশুর মনস্তত্ত্ব অনুধাবনের অপূর্ব ক্ষমতা এবং সমাজভাবনা তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিকে করেছিল স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
হেলেনা খান ১৯২৩ সালের ২৩শে মার্চ ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর থানার কলতাপাড়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুজাফফর আলী ফকির এবং মাতার নাম খাতেমুন নেসা।
শৈশবেই তিনি জীবনের প্রথম কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। মাত্র নয় মাস বয়সে তাঁর মাতাবিয়োগ ঘটে। মাতৃহীন শিশুকে পরম স্নেহে লালন-পালন করেন তাঁর মাতামহী (নানি)। শৈশবের এই মাতৃহীনতা ও মাতামহীর ছায়াতলে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর কোমল মনে বিশেষ ছাপ ফেলেছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক সংবেদনশীলতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
শিক্ষা ও মেধা
তৎকালীন সময়ে মুসলিম সমাজে নারী শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত সীমিত ছিল। কিন্তু হেলেনা খান নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজের মেধা ও নিষ্ঠার জোরে শিক্ষাজীবনে অনন্য সাফল্য অর্জন করেন।
১. প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: তিনি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী রাধা সুন্দরী বালিকা বিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে মেট্রিকুলেশন (এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
২. উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা: এরপর তিনি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (এইচএসসি) পাস করেন। পরবর্তীতে তিনি কলকাতার খ্যাতনামা ‘লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ’-এ ভর্তি হন এবং ১৯৪৮ সালে ব্যাচেলর অব আর্টস (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
৩. প্রশিক্ষণ ও বিদেশ যাত্রা: দেশভাগের পর ঢাকায় ফিরে ১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকার টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে ‘ব্যাচেলর ইন ট্রেনিং’ (বিটি) সম্পন্ন করেন। উল্লেখ্য, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন।
৪. বিদেশি উচ্চশিক্ষা: শিক্ষায় আরও দক্ষতার উদ্দেশ্যে তিনি যুক্তরাজ্যে গমন করেন। ১৯৫১-১৯৫২ সালে ঐতিহ্যবাহী লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি যথাক্রমে ‘শিক্ষা’ (Education) এবং ‘ইংরেজি’ (English) বিষয়ে দুটি উচ্চতর ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন ও শিক্ষাব্রত
হেলেনা খানের কর্মজীবনের সূচনা ঘটেছিল একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে। ১৯৪৯ সালে তিনি শিক্ষকতায় পদার্পণ করেন।
- শিক্ষক হিসেবে বিস্তার: তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলের বহু খ্যাতনামা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
- বিভাগীয় সাফল্য: ১৯৫৪ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত তিনি ময়মনসিংহের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ‘বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’-এর সহকারী প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা এতটাই অতুলনীয় ছিল যে, তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বকনিষ্ঠ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি সরকারি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রবাস যাপন
১৯৫০ সালে হেলেনা খান বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আজিজুর রহমান খানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসার জীবন ছিল সুখের ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ। এই দম্পতির তিনটি পুত্র এবং একটি কন্যা সন্তান রয়েছে।
১৯৯২ সালে স্বামী আজিজুর রহমান খান মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে হেলেনা খান তাঁর সন্তানদের সান্নিধ্যে মূলত উত্তর আমেরিকায় (যুক্তরাষ্ট্র) বসবাস করতে শুরু করেন। দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের সুবাদে ২০০৪ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে তিনি তাঁর প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব এবং নাড়ির টান শেষ দিন পর্যন্ত বজায় রেখেছিলেন।
সাহিত্য সাধনা ও অবদান
হেলেনা খান ছিলেন একপ্রস্থ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি ৫০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। নিচে তাঁর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. শিশুসাহিত্য
বাংলা শিশুসাহিত্যে হেলেনা খানের অবদান চিরস্মরণীয়। শিশুতোষ মানসিকতা, রূপকথা, অ্যাডভেঞ্চার ও রূপক গল্পের সমন্বয়ে তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য এক অদ্ভুত স্বপ্নিল জগৎ তৈরি করেছিলেন। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থ:
- রূপকথার রাজ্যে
- বুদ্ধির বাহাদুরী
- তুলতুলের দান
- নীল পাহাড়ের হাতছানি
- ভূতের খপ্পরে
- মজার মজার গল্পগুলো
- সাতটি রঙের রংধনু
- চারটি বেলুন
- কারামুক্তি
- ছোট্ট রেড রাইডিং হুড
- লোভী রাজা লোভী রানী
- রাজার আজব পোশাক
- তুষারকুমারী ও সাতবামন
- রোদ ঝকঝকে
২. উপন্যাস ও গল্প
শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্যও তিনি সৃষ্টি করেছেন বেশ কিছু কালজয়ী উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ। তাঁর রচনায় মানুষের সুখ-দুঃখ, মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন ও নারীদের আত্মসামাজিক বাস্তবতা উঠে এসেছে।
- উপন্যাস:লেখনী, শ্বাপদসংকুল অরণ্যে, দুই ধাপ পৃথিবী, আত্মজা ও মুক্তিযুদ্ধ।
- গল্পগ্রন্থ:বৃত্তের বাইরে, পান্নার জন্য, প্রবাসে সায়ংকালে, পাপড়ির রং বদলায়, নির্বাচিত গল্প।
৩. অনুবাদ সাহিত্য
বিশ্বসাহিত্যের বহু অমূল্য রত্নকে তিনি অত্যন্ত সাবলীল বাংলায় অনুবাদ করে বাঙালি পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত অনুবাদ গ্রন্থগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—
- মাঞ্চ-এর মজার গল্প
- হ্যানসেল এ্যান্ড গ্রেটেল
৪. মুক্তিযুদ্ধ ও ইতিহাসভিত্তিক রচনা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ তাঁর চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ইতিহাস তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন—
- মুক্তিযুদ্ধের গল্প
- একাত্তরের কাহিনী
- আত্মজা ও মুক্তিযুদ্ধ
৫. প্রাবন্ধিক ও ভ্রমণকাহিনী
জীবন সায়াহ্নে এসে তিনি স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ ও ভ্রমণের বিচিত্র অভিজ্ঞতা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন।
- প্রবন্ধ ও স্মৃতিচারণ:আমার পরিচিতি, বৃহত্তম ময়মনসিংহের কয়েকজন বিশিষ্ট নারী, আমার স্মৃতিতে ভাস্বর, ঊষা থেকে গোধূলির স্মৃতি।
- ভ্রমণকাহিনী:নতুন দেশ নতুন মানুষ, স্বপ্নের দেশ, নবীর দেশ, সিন্ধুর টিপ, সিংহল দ্বীপ, গৌতমবুদ্ধের দেশে।

৬. জীবনী গ্রন্থ
শিশুদের নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় ইতিহাসের জ্ঞান দিতে তিনি বহু মহাপুরুষের জীবনী রচনা করেন। এর মধ্যে নবী আদম, নবী নূহ, নবী ইউনুস (আ:), নবী ইবরাহীম, আমাদের মহানবী মুহাম্মদ (সা.) এবং হযরত বেলাল (রা:)-এর জীবনী অন্যতম।
পুরস্কার ও স্বীকৃতিসমূহ
বাংলা সাহিত্যে ও শিক্ষা অঙ্গনে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ হেলেনা খান জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায় থেকে বহু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
১. নুরুন্নেসা খাতুন বিদ্যাবিনোদিনী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭৬) – সাহিত্যে প্রাথমিক অবদানের জন্য।
২. বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার (২০০১) – শিশুসাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য।
৩. বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮) – শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য প্রাপ্ত অন্যতম সম্মাননা।
৪. একুশে পদক (২০১০) – ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদানকৃত দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।
জীবনাবসান
জীবনের শেষ দিনগুলো হেলেনা খান তাঁর সন্তানদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাটান। ২০১৯ সালের ১৫ই মার্চ, ৯৫ বছর বয়সে (মতান্তরে ৯১ বছর) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া রাজ্যের আটলান্টা শহরের পিডমন্ট হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তাঁকে আটলান্টার লরেন্সভিলে অবস্থিত মুসলিম সেমেটারিতে (কবরস্থান) পূর্ণ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
হেলেনা খান কেবল একজন লেখিকা বা শিক্ষিকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারী জাগরণ ও প্রগতির এক অনন্য প্রতীক। পারিবারিক মাতৃহীনতা ও সমাজের প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে তিনি যেভাবে নিজেকে উচ্চশিক্ষিত করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে শিক্ষার আলো ও সাহিত্যের রসে সমৃদ্ধ করেছেন, তা অনুকরণীয়। তাঁর লেখা কালজয়ী শিশুসাহিত্য ও অন্যান্য রচনার মধ্য দিয়ে তিনি বাঙালি পাঠকের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবেন।
তার লিখিত কিছু বই :
০১. স্বপ্নের দেশ নবীর দেশ
লেখক : হেলানা খান
০২. নবী ইউনুস
লেখক : হেলেনা খান

