একটি মানুষের জীবন কেবল কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং তা হলো সত্যের সন্ধান, আদর্শের লড়াই এবং অবিরাম জ্ঞানচর্চার এক মহাকাব্য। মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবন ঠিক তেমনই এক অনুপ্রেরণাদায়ী আখ্যান, যেখানে মিশে আছে গ্রামীণ শৈশবের সারল্য, সামরিক জীবনের কঠোর শৃঙ্খলা এবং অন্তহীন দ্বীনি ইলম অন্বেষণের এক ব্যাকুলতা। নিচে তাঁর এই গৌরবময় ও বৈচিত্র্যময় জীবনধারাকে বিস্তারিত ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করা হলো:

প্রখ্যাত ইসলামিক স্কলার ও গবেষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী কে লেখক মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন তার লেখা হাদিসের নামে ভিত্তহীন কথা বইটি উপহার দিচ্ছেন ।
সত্যসন্ধানী এক আলোকের অভিযাত্রা: মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবনগাথা
১. জন্ম, বংশপরিচয় ও শুভক্ষণ
বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের প্রাক্কালে, বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী ও পুণ্যময় জনপদে আগমন করেন মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন। তাঁর জন্ম হয়েছিল তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুর ও বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার অন্তর্গত গোপালপুর গ্রামের এক অত্যন্ত সাধারণ, শান্ত ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে।
সরকারি নথিপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী তাঁর জন্মতারিখ ১ জুলাই ১৯৭৪ সাল হিসেবে লিপিবদ্ধ হলেও, পারিবারিক স্মৃতি এবং ঘনিষ্ঠজনদের নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে তাঁর মূল জন্ম ছিল ১৯৭০ সালের কোনো এক শুভ ক্ষণে। এক গ্রামীণ ও মায়াময় পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি যে ভবিষ্যতে ইসলামের জ্ঞানজগতে এবং গবেষণার ময়দানে একনিষ্ঠ অবদান রাখবেন, তা হয়তো সেদিনের সেই চেনা পরিবেশের কেউ আঁচ করতে পারেনি।
২. পিতা-মাতা, পারিবারিক আবহ ও শৈশবের দিনগুলি
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবনের ভিত্তিমূল গড়ে উঠেছিল তাঁর পিতা-মাতার যোগ্য ও আদর্শিক তত্ত্বাবধানে। তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা মুহাম্মদ সামসুল হক ছিলেন একজন অত্যন্ত সরল, সোজা, ধর্মপ্রাণ ও কঠোর নীতিবান মানুষ। আর তাঁর রত্নগর্ভা মাতা রাবেয়া বেগম ছিলেন মায়া ও মমতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মায়ের অবারিত স্নেহ-ভালোবাসা এবং বাবার কঠোর শৃঙ্খলা ও আদর্শিক শাসনের এক অপূর্ব মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্যের মধ্য দিয়ে তিনি বড় হতে থাকেন।
শৈশবেই তাঁর মেধার স্ফূরণ ঘটেছিল। নিজ গ্রামের ঐতিহাসিক ‘দক্ষিণ গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর আঙিনায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়। শৈশব থেকেই তিনি এমন একটি পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ পেয়েছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ জ্ঞানচর্চাবান্ধব ও কলুষতাহীন।
সবচেয়ে সৌভাগ্যের বিষয় ছিল, তাঁদের বাড়ির একেবারে কোল ঘেঁষেই অবস্থিত ছিল ‘দারুল উলুম গোপালপুর ইসলামিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা’। বাড়ির পাশে এই দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় শৈশব ও কৈশোরের একটা বিশাল ও সোনালী সময় তাঁর কেটেছে এই মাদ্রাসা চত্বরে। মাদ্রাসার রুহানি পরিবেশের প্রভাবে অত্যন্ত ছোটবেলা থেকেই তিনি নিয়মিত ও নিষ্ঠার সাথে সালাত (নামাজ) আদায়ে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
সেই মাদ্রাসার মুহতারাম মোহতামিম (প্রধান শিক্ষক) সাহেব ছিলেন তাঁর পরম আত্মীয়। এই সুবাদে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন সাধারণ স্কুলে পড়াশোনা করলেও তাঁর মনস্তত্ত্ব, রুহানিয়্যাত ও প্রাত্যহিক জীবন গড়ে উঠেছিল খাঁটি মাদ্রাসার আবহে। ফলে ইসলামের প্রতি এক গভীর অনুরাগ ও নিখাদ সুধারণা নিয়ে তিনি বেড়ে ওঠেন। তৎকালীন পরিবেশের কারণে তাঁর আমল-আকিদা ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি কওমি ঘরানার আলেমদের অনুগামী হয়ে গড়ে উঠতে শুরু করে।
এই দেওবন্দী ও কওমি ঘরানার প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসের একটি চমৎকার ও বাস্তব উদাহরণ তাঁর জীবনের এক ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয়। ১৯৮৮ সালের কথা, তখন তিনি নবম শ্রেণীর ছাত্র। কৈশোরের চপলতায় স্থানীয় ছাত্র শিবিরের কিছু কর্মী তাঁকে একটি সদস্য ফরম পূরণ করায়। না বুঝে ফরম পূরণ করলেও মনে একধরণের আনন্দ নিয়ে তিনি এই কথা তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় আত্মীয়, সেই মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেবকে জানান। মুহতামিম সাহেব স্নেহের সুরে তাঁকে সতর্ক করে বলেন,
“তুমি এখনো ছোট, রাজনীতি বুঝবে না। শিবির করা ভালো না, ওদের ঈমান ও আকিদাগত কিছু সমস্যা আছে।”
যেহেতু ছোটবেলা থেকেই সেই মুহতামিম সাহেব এবং কওমি মাদ্রাসার প্রতি তাঁর মনে ছিল অগাধ শ্রদ্ধা ও সুধারণা, তাই শিক্ষকের সেই একটি উপদেশই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর আর কোনোদিন ছাত্র শিবিরের বা জামায়াতে ইসলামীর কোনো কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কথা তাঁর মাথায় আসেনি। বরং জামায়াত ঘরানার রাজনীতি ও আদর্শ সম্পর্কে তাঁর মনে একটি স্থায়ী নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়।
এই ঘটনার পর তিনি সম্পূর্ণ অরাজনৈতিকভাবে দ্বীনের খেদমত করার পথ খোঁজেন এবং অত্যন্ত ছোটবেলা থেকেই দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের সাথে যুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে যখন তিনি মাত্র অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, তখন থেকেই তিনি তাবলীগী জামায়াতের সাথে প্রথম সময় লাগান। এরপর জীবনের এক সুদীর্ঘ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি এই দাওয়াত ও তাবলীগের আমলের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রেখেছিলেন।
৩. শিক্ষা জীবন ও মেধার দ্যুতি
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের প্রাথমিক শিক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর, ১৯৮৫ সালে তিনি নিজ গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘গোপালপুর করিমুন্নেছা উচ্চ বিদ্যালয়’-এ ভর্তি হন। এই বিদ্যালয়ে তিনি অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তিনটি বছর পার করেন। তাঁর মেধা ও অধ্যবসায় ছিল সমসাময়িক সবার চেয়ে আলাদা, যার প্রমাণস্বরূপ ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম—প্রতিটি শ্রেণীতেই তিনি মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
ছেলের এই অভাবনীয় মেধা ও পড়াশোনার প্রতি একনিষ্ঠতা দেখে পিতা মুহাম্মদ সামসুল হকের মনে তীব্র ইচ্ছা জাগে যে, ছেলেকে আরও উন্নত ও মানসম্মত কোনো প্রতিষ্ঠানে পড়াতে হবে। যেই চিন্তা, সেই কাজ। ছেলের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ১৯৮৭ সালে তিনি তৎকালীন কোটালীপাড়া উপজেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কোটালীপাড়া পাবলিক ইনস্টিটিউশন’-এ ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন।
নতুন ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে এসেও মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন তাঁর মেধার স্বাক্ষর বজায় রাখেন। এই বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে তিনি কৃতিত্বের সাথে বৃত্তি লাভ করেন, যা ছিল তাঁর পিতার প্রথম বড় স্বপ্নপূরণ। এরপর এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকেই তিনি অত্যন্ত সুনামের সাথে প্রথম বিভাগে এসএসসি (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এসএসসিতে প্রথম বিভাগে সাফল্যের পর পিতার স্বপ্ন ও প্রত্যাশার পরিধি আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি চাইলেন ছেলেকে দেশের রাজধানী ঢাকার কোনো নামকরা কলেজে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাবেন। সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি ছেলেকে ঢাকার বিখ্যাত ” সরকারি তিতুমীর কলেজ“-এ উচ্চ মাধ্যমিকে (এইচএসসি) ভর্তি করান।
কিন্তু ঢাকার মতো ব্যয়বহুল শহরে রেখে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালানো সেই সময়ে তাঁর সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পিতার পক্ষে অত্যন্ত দূরূহ ও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। একদিকে পিতার আকাশচুম্বী আশা, অন্যদিকে তীব্র আর্থিক অনটন—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তরুণ ইস্রাফিল এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। পিতার ওপর আর্থিক চাপ কমাতে তিনি পড়াশোনা করা অবস্থাতেই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমান সেনা নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নেন এবং মেধার ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে নিয়োগপত্র (Appoinment Letter) লাভ করেন।
একদিকে উচ্চশিক্ষার মোহ, অন্যদিকে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদ। অনেক গভীর ভাবনা-চিন্তার পর, পিতার কষ্ট লাঘব করতে তিনি ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একজন গর্বিত বিমান সেনা হিসেবে ‘বাংলাদেশ বিমান বাহিনী‘-তে যোগদান করেন।
তবে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও জ্ঞানের প্রতি তাঁর যে তীব্র তৃষ্ণা, তা বিন্দুমাত্র কমেনি। চাকুরিরত অবস্থায় কঠোর ডিউটির পাশাপাশি তিনি পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং ১৯৯৫ সালে সফলভাবে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ১৯৯৮ সালে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিনে স্নাতক (বিএ) পরীক্ষায় অংশ নেন এবং কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। নিজের কর্মক্ষেত্রের যোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য তিনি বিমান বাহিনীর চাকুরির সুবাদে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ‘অ্যারোনটিক্স’ (Aeronautics)-এর ওপর অত্যন্ত সফলতার সাথে একটি ডিপ্লোমা কোর্সও সম্পন্ন করেন।
৪. ইলমে দ্বীন অর্জন ও আত্মশুদ্ধির পথ
বিমান বাহিনীতে যোগদানের পরও মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবনের মূল চালিকাশক্তি ছিল দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ এবং দ্বীনি ইলমের অনুসন্ধান। তাঁর প্রাত্যহিক রুটিনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল—অফিসের নির্ধারিত ডিউটির সময়টুকু বাদে বাকি সমস্ত অবসর সময় আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতে এবং কিতাব অধ্যয়নে ব্যয় করা। যেহেতু তখন সংসারে কোনো বড় ধরনের বৈষয়িক ঝামেলা বা পারিবারিক জটিলতা ছিল না, তাই ডিউটির বাইরের বিশাল অবসর সময়টাকে তিনি জীবনের শ্রেষ্ঠ সুযোগ হিসেবে লুফে নেন।
এই দীর্ঘ অবসর সময়ে তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীম তাজবীদসহকারে সহীহ শুদ্ধভাবে শেখার পাশাপাশি উম্মুল আলসিনা বা ভাষার জননী ‘আরবি ভাষা’-র ওপর পূর্ণ দক্ষতা অর্জনের জন্য কঠোর সাধনা শুরু করেন। মহান আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত ছিল যে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রতিটি ঘাঁটিতে (Air Base) একটি করে বিশাল ও সমৃদ্ধ সেন্ট্রাল লাইব্রেরী থাকে। এর পাশাপাশি প্রতিটি ঘাঁটির কেন্দ্রীয় মসজিদের সাথেও ইসলামিক বইয়ের একটি আলাদা ও সমৃদ্ধ পাঠাগার থাকে। চাকুরির সুবাধে প্রথম পোষ্টিং হয় বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান, যশোহরে, সেখানে এর কোন ব্যতিক্রম ছিল না, ঘাঁটির পাশাপাশি মসজিদে ছিল সমৃদ্ধ ইসলামী পাঠাগার। জ্ঞানপিপাসু ইস্রাফিল এই সুযোগটিকে পূর্ণরূপে কাজে লাগান। অবসর সময় নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন।
কৈশোরের সেই মনস্তত্ত্ব এবং কওমি-তাবলিগী ঘরানার আলেমদের প্রতি সুধারণা থাকার কারণে তিনি সে সময় জামায়াত ঘরানার কোনো আলেম, যেমন মওলানা মওদূদী (রহ.), অধ্যাপক গোলাম আযম বা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর কোনো বই স্পর্শও করতেন না। বরং তিনি গভীর নিমগ্নতায় পড়তেন ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দী ঘরানার আলেমদের কিতাবসমূহ। তাঁর অধ্যয়নের তালিকায় শীর্ষে ছিলেন পাকিস্তানের বিখ্যাত মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.), তাঁর সুযোগ্য সন্তান জাস্টিস মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী, হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহ.), হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.), বাংলার বাঘ খ্যাত শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.), মাসিক মদীনার কিংবদন্তী সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান এবং শায়খুল হাদীস আজিজুল হক (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ মনীষীদের কিতাবসমূহ। তবে একটি কথা না বললেই নয়। তিনি প্রথমিক জীবনে জামায়াত ঘরানার আলেমদের বই না পড়লেও। পরবর্তীতে গবেষণার প্রয়োজনে সাইয়েদ মাওলানা মউদুদির প্রায় সকল বইয়ে পাঠ করেন।
এই নিয়মতান্ত্রিক অধ্যয়নের ধারাবাহিকতায় তিনি ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক গ্রন্থ, ইমাম গাজ্জালী (রহ.) রচিত চার খণ্ডের বিশাল বিশ্বকোষ ‘এহয়াউ উলুমিদ্দীন’ (احیاء علوم الدین) সম্পূর্ণ পড়ে সমাপ্ত করেন। এই কিতাবটি তাঁর চিন্তজগতে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করে, যেখানে ইমাম গাজ্জালী ইসলামের বাহ্যিক বিধিবিধান (শরীয়ত) এবং ভেতরের আধ্যাত্মিক ও মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোর (তরিকত ও তাসাউফ) এক অপূর্ব ও ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এরপর একে একে তিনি ইমাম গাজ্জালীর ‘কিমিয়ায়ে সা’আদাত‘, ‘মুকশাফাতুল কুলুব‘ এবং ইমাম ইবনে কাসীরের বিখ্যাত ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া‘-সহ অসংখ্য কালজয়ী কিতাব পড়ে নিজের জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেন।
একই সময়ে তিনি মুফতি শফী (রহ.)-এর লেখনী থেকে নিঃসৃত মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের কালজয়ী তাফসীর ‘মাআরেফুল কুরআন‘ -এর ওপর গভীর গবেষণা চালান, যা মূলত সৌদি আরব সরকারের উদ্যোগে পরবর্তীতে সংক্ষেপিত আকারে এক খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন এই তাফসীর গ্রন্থটি দিনের পর দিন অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পাঠ করতেন এবং এর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাত্ত্বিক আলোচনা নিজের ডায়েরিতে নোট করে রাখতেন। এর পাশাপাশি আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর মূল কিতাব এবং মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)-এর অনূদিত অসংখ্য কিতাব অত্যন্ত যত্নসহকারে পড়ার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল।
৫. আরবি ভাষার ওপর বুৎপত্তি ও অনুবাদ সাহিত্য
নিজের অদম্য ইচ্ছা, প্রবল মেধা এবং মাদ্রাসার একজন সুযোগ্য ও দরদী শিক্ষকের আন্তরিক সহায়তায় মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন অল্প সময়ের মধ্যেই আরবি ভাষার ব্যাকরণ, শব্দশৈলী ও সাহিত্যের ওপর এক অসাধারণ ও মজবুত দখল নিয়ে আসেন। আরবি ভাষার এই গভীর জ্ঞানই তাঁর জীবনের পরবর্তী গবেষণার মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছিল।
এরই ফলশ্রুতিতে, যখন তিনি ১৯৯৮ সালে তাঁর স্নাতক বা ব্যাচেলর (বিএ) পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ বিষয়ের পাশাপাশি ইসলামিক হিস্ট্রি (ইসলামের ইতিহাস), ইসলামিক স্টাডিজ এবং মূল ‘আরবি সাহিত্য’ (Arabic Literature)-কে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে পরীক্ষা দেন এবং চমৎকার ফলাফল করেন।
আরবি ভাষার এই গভীর বুৎপত্তিকে তিনি শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং সাধারণ মুসলিমদের কুরআন বোঝার পথ সহজ করতে তিনি একটি চমৎকার গবেষণামূলক বই রচনা করেন, যার নাম “কুরআন শিক্ষা ও বুঝার কৌশল”। শুধু মৌলিক গ্রন্থ রচনাই নয়, তিনি আরবি ভাষার সমসাময়িক ও প্রাচীন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবসমূহ সরাসরি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে শুরু করেন। এ পর্যন্ত দেশের অন্যতম পাঠকপ্রিয় প্রকাশনী ‘রিফাইন পাবলিকেশন’ -এর মাধ্যমে তাঁর অনূদিত মোট ১১টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়ে আলোর মুখ দেখেছে। এছাড়া তাঁর করা আরও বহু মূল্যবান অনুবাদ গ্রন্থ বর্তমানে প্রকাশের অপেক্ষায় পাণ্ডুলিপি আকারে প্রেসে রয়েছে।

বহু গ্রন্থ প্রনেতা মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন (মাঝে), যিনি মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন– এর প্রায় সকল বই সম্পাদনা করে থাকেন। তিনি একটি বইয়ের মোড়ক উম্মচন অনুষ্ঠানে সম্মাননা স্মারক দিচ্ছেন। পাশে আছেন রিফাইন পাবলিকেশন (Refine Publications) এর সম্মানিত প্রকাশক মুহাম্মদ এহতেশাম।
৬. সুদীর্ঘ কর্মজীবন: আকাশে ও মাটিতে
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দীর্ঘ। তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ একটি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সেবায় উৎসর্গ করেছেন। ১৯৯৩ সাল থেকে শুরু করে একটানা ২০২৪ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৩১টি বছর তিনি অত্যন্ত সততা, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সাথে বিমান বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন।
সামরিক জীবনে তিনি একজন দক্ষ ‘টেকনিশিয়ান’ (কারিগরি বিশেষজ্ঞ) হিসেবে দেশের আকাশসীমা রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান (Fighter Jet) এবং সামরিক হেলিকপ্টার রক্ষণাবেক্ষণের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল টেকনিক্যাল দায়িত্ব পালন করেন।
নিজের মূল ইচ্ছার বাইরে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার খাতিরে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ক্রীড়াঙ্গনের সাথেও জড়িয়ে পড়েন। তাঁর শারীরিক গঠন ও দক্ষতার কারণে ২০০৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ এক যুগ তিনি বিমান বাহিনীর ঐতিহ্যবাহী ‘শারীরিক যোগ্যতা স্কুল’ (School of Physical Fitness)-এর একজন প্রশিক্ষক বা ইন্সট্রাক্টর হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
তবে এই শারীরিক প্রশিক্ষকের দায়িত্বে থাকার সময় মহান আল্লাহর এক বিশেষ মেহেরবানি ছিল যে, তিনি ডিউটির পর প্রচুর অবসর সময় পেতেন। জাগতিক কোনো আমোদ-প্রমোদে এই সময় নষ্ট না করে, এর প্রতিটি মুহূর্ত তিনি ব্যয় করেছেন গভীর ইসলামিক পড়াশোনা, নোট তৈরি এবং গবেষণার কাজে।
চাকুরি জীবনের শেষভাগে তিনি বিমান বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ‘জুনিয়র অফিসার ইন চার্জ’ হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুদীর্ঘ ৩১ বছরের কর্মজীবনে দুটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল—বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিক্যাল সেন্টার’ (BAC) ‘এবং বিমান বাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ‘জহুরুল হক ঘাঁটি’-র রক্ষণাবেক্ষণ শাখার ‘অ্যাডজুটেন্ট’ (Adjutant) হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। এই গুরুদায়িত্বগুলো তাঁর প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
৭. পারিবারিক জীবন: সুখ ও সফলতার এক আদর্শ নীড়
সামরিক শৃঙ্খলা আর গভীর জ্ঞানসাধনার সমান্তরালে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন পারিবারিক জীবনেও একজন অত্যন্ত সফল ও দায়িত্বশীল গৃহকর্তা। ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসে তিনি কোটালীপাড়া উপজেলার উত্তরপাড়া গ্রামের মরহুম আজাহার উদ্দিনের সুযোগ্য কন্যা নাসরিন আক্তার-এর সাথে পবিত্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে নাসরিন আক্তার কেবল তাঁর সহধর্মিণীই নন, বরং তাঁর জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে, বিশেষ করে চাকরি ও সাহিত্য সাধনার দিনগুলোতে এক অনন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে পাশে ছিলেন।
সংসার জীবনে মহান আল্লাহ তাআলা এই দম্পতিকে তিনটি সন্তান প্রদান করেন। তাদের এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান দিয়ে আল্লাহ তায়ালা ধন্য করেছেন। মা-বাবার সুশিক্ষা, আদর্শ ও কঠোর শৃঙ্খলার ছায়ায় বেড়ে ওঠা প্রতিটি সন্তানই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে অত্যন্ত মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন:
- বড় মেয়ে (মুমতাহীনা বন্যা): দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে বিএসসি (অনার্স) সম্পন্ন করেছেন।
- বড় ছেলে (ইশতিয়াক আহম্মদ): ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (IBA) থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অনার্স এবং পরবর্তীতে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
- ছোট ছেলে (জুবায়ের আহম্মদ): আধুনিক যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগ থেকে তাঁর অনার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছেন।
সন্তানদের এই গৌরবোজ্জ্বল উচ্চশিক্ষা ও আদর্শ চরিত্র গঠন মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। এক কথায়, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নিখাদ ভালোবাসা, দ্বীনি আমেজ আর সন্তানদের ঈর্ষণীয় সাফল্যে ঘেরা এই পরিবারটি বর্তমান সমাজের বুকে এক অনুকরণীয় ও সুখী পরিবারের প্রতিচ্ছবি।
৮. সত্যের আলো ও সঠিক দ্বীনের অনুসন্ধান
ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে বিমান বাহিনীর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের সাথে গভীরভাবে যুক্ত থাকার কারণে এক সময় খুব চমৎকার, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী বয়ান (বক্তৃতা) দিতে শিখেছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাবলীগী গিয়ে মসজিদে বয়ান করতেন।
কিন্তু সেই বয়ানগুলোর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কেবল ঈমান ও ইয়াকিনের ওপর হলেও, বাস্তবে তা ছিল একধরণের লোকমুখে প্রচলিত কথার পুনরাবৃত্তি—অর্থাৎ “যা বড়দের থেকে শুনছি, তাই সাধারণ মানুষের সামনে বলছি।”
পরবর্তীতে নিজের আত্মোপলব্ধি থেকে অত্যন্ত সততা ও বিনয়ের সাথে তিনি বলেন–
“সে সময় শির্ক, বিদআত এবং হাদীসের ক্ষেত্রে সহীহ, জাল ও যয়ীফ (ضعیف) হাদীসের পার্থক্য সম্পর্কে আমার কোনো সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ছিল না। যার কারণে নিজের অজান্তেই কত শত শির্ক, বিদআত, জাল ও দুর্বল বর্ণনা মানুষের মাঝে প্রচার করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তবে মানুষের প্রতি আমার আমলে সলেহা বা নেক আমলের আহ্বানটা ছিল এক্কেবারে নিরেট ও বিশুদ্ধ।”
তিনি দাওয়াতের পাশাপাশি প্রচুর পড়াশোনা করলেও সহীহ ও জালের ভেদাভেদ করার মতো মানদণ্ড জানা না থাকার কারণে মনে কখনো কোনো প্রশ্ন জাগেনি। দেওবন্দী ঘরানার কিতাবে যা পেয়েছেন, তা-ই পরম সত্য বলে বিশ্বাস করেছেন এবং তা-ই প্রচার করেছেন। এমনকি তিনি প্রতি মাসে কওমি ঘরানার শীর্ষস্থানীয় আলেমদের দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত ৪ থেকে ৫টি বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা নিয়মিত রাখতেন। মাসিক পত্রকাগুলোর প্রতিট প্রবন্ধ মনোযোগসহকাল পড়তেন। সেই পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল:
- হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক মঈনুল ইসলাম’
- পটিয়া মাদ্রাসা থেকে প্রকাশিত মাসিক আত-তাওহীদ’ ‘
- ঢাকা থেকে প্রকাশিত ঐতিহ্যবাহী ‘মাসিক মদীনা’‘
- ‘মাসিক রাহমানী পয়গাম’
- ‘মাসিক আদর্শ নারী’
এমনকি চরমোনাইয়ের পীর সাহেবদের লিখিত তাসাউফের কিতাবগুলোও তাঁর গভীর অধ্যয়ন থেকে বাদ যায়নি। তখন তিনি মনে করতেন, উপমহাদেশে দেওবন্দী ও কওমি আলেমদের প্রতিটি দল ও উপদলই সম্পূর্ণ সঠিক পথের ওপর রয়েছে।
৯. ইন্টারনেটের দুনিয়া ও চিন্তার জগতে মহাবিপ্লব
কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য মহান আল্লাহর এক বিশেষ ফয়সালা নির্ধারিত ছিল ২০০৭ সালে। এই বছরে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন নিজের গবেষণার কাজের সুবিধার্থে একটি কম্পিউটার ক্রয় করেন এবং তাতে ইন্টারনেট সংযোগ নেন। আর এই ইন্টারনেটের অবারিত দুনিয়াই তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা চিন্তার জগতকে আমূল ওলটপালট করে দেয়।
ইন্টারনেটের কল্যাণে তিনি প্রচলিত দেওবন্দী আলেমদের সীমাবদ্ধ গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি মক্কা-মদীনা তথা সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও মুহাদ্দিসগণের কিতাব ও ফতোয়া অনুবাদের সংস্পর্শে আসেন। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি যেসকল বিশ্বখ্যাত যুগশ্রেষ্ঠ সালাফী ও আন্তর্জাতিক আলেমদের বই পড়ার সুযোগ পান, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
- ইমাম আব্দুল আজীজ বিন বায (রহ.)
- শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.)
- শায়খ সালেহ আল-ফাউজান
- শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহ.)
- শায়খ জামিল যাইনু (রহ.) প্রমুখ।
এই মহান আলেমদের কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলিলের ওপর ভিত্তি করে লেখা কিতাবসমূহ পড়ার সাথে সাথেই মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের দীর্ঘদিনের অর্জিত জানা ইলমের ওপর সন্দেহের তীব্র তীর বিদ্ধ হতে শুরু করে। তিনি তো আগে মনে করতেন চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের লেখা সব বই সম্পূর্ণ সঠিক ও আধ্যাত্মিকতায় ভরপুর। কিন্তু একদিন আচমকা ইন্টারনেটে প্রখ্যাত গবেষক মাওলানা মতিউর রহমান মাদানী সাহেবের একটি ভিডিও ওয়াজ শুনে তিনি চরম দিশেহারা হয়ে পড়েন। সেই বক্তব্যে মতিউর রহমান মাদানী সাহেব চরমোনাইয়ের সাবেক পীর মাওলানা ইশহাক সাহেবের লেখা বহুল পঠিত দুটি বই ‘ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা’ এবং ‘আশেক মাশুক’ নিয়ে অত্যন্ত চুলচেরা ও দলীলভিত্তিক আলোচনা করছিলেন। মাদানী সাহেব সেই বই দুটির পৃষ্ঠা নম্বর উল্লেখ করে, প্রতিটি লাইন পড়ে পড়ে তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভয়াবহ শির্ক ও বিদআতের স্বরূপ উন্মোচন করছিলেন।
প্রথমে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন একজন খাঁটি দেওবন্দী ভক্ত হিসেবে মতিউর রহমান মাদানীর এই কঠোর সমালোচনা একেবারেই বিশ্বাস করতে পারেননি, বরং মনে মনে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু একজন সত্যসন্ধানী মানুষ কখনো অন্ধ অনুকারী হতে পারে না। তাই তিনি নিজ দায়িত্বে বাজার থেকে চরমোনাইয়ের সেই মূল বই দুটি সংগ্রহ করেন এবং মাদানীর বক্তব্যের সাথে অক্ষর মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে থাকেন।
যখন তিনি নিজের দাওয়াতী জীবনের অভিজ্ঞতা এবং কুরআন-সুন্নাহর কষ্টিপাথরে সেই বইগুলো মেলালেন, তখন তাঁর চোখ কপালে উঠল। তিনি নিশ্চিত হলেন যে, মতিউর রহমান মাদানী মতিউর রহমান মাদানী কোনো মিথ্যা বা বানিয়ে কথা বলেননি, বরং কিতাবগুলোতে সত্যিই মারাত্মক আকিদাগত বিভ্রান্তি ও শির্ক মিশ্রিত সুফীবাদের কথা রয়েছে।
এই সত্য প্রকাশের পর তিনি আর অন্ধ হয়ে বসে থাকেননি। তিনি একদিকে সালাফী আলেমদের কিতাব এবং অন্যদিকে দেওবন্দী ঘরানার আলেমদের কিতাব পাশাপাশি টেবিলের ওপর রেখে নিরপেক্ষভাবে তুলনা ও গভীর পড়াশোনা শুরু করেন। এই সময় তিনি কওমি মাদ্রাসার উচ্চতর নেসাবভুক্ত (পাঠ্যসূচি) একটি কিতাব হাতে পান, যা মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দিন সাহেব কর্তৃক লিখিত—‘ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’। এ কিতাবটিতে লেখক সরাসরি উল্লেখ করেছেন যে, সৌদি আরবের আলেম তথা সালাফী বা ওহাবীগণের সাথে জমহুর উম্মাহর (মূলত দেওবন্দী আলেমদের) প্রধান ৬টি মৌলিক বিষয়ে গভীর মতভেদ বা ভিন্নমত রয়েছে। বিষয় ৬টি হলো:
১. মাযহাবের তাকলীদ করার প্রসঙ্গ: (নির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ করা ওয়াজিব কি না)।
২. তাসাউফ তথা সুফিবাদ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি: (প্রচলিত পীর-মুরিদী ও তরিকার বৈধতা)।
৩. দুআর মাঝে উসীলা প্রসঙ্গ: (মৃত অলী-বুজুর্গদের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে দুআ করা)।
৪. তাবীজ-কবজ ও সুতা সুতা ব্যবহারের বিধান: (লটকন বা তাবীজ ঝোলানো শির্ক কি না)।
৫. অলী-আওলিয়াদের স্মৃতিবিজড়িত স্থান থেকে বরকত লাভ প্রসঙ্গ: (মাজার বা ঐতিহাসিক স্থান ছুঁয়ে বরকত খোঁজা)।
৬. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা জিয়ারতের নিয়ত করার সম্পর্ক: (সরাসরি রওজার নিয়তে সফর করা নাকি মসজিদের নিয়তে)।
(সূত্র: মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দিন, ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ, প্রকাশক: মাকতাবাতুর আবরার, প্রকাশকাল: ২০০৭, পৃষ্ঠা: ৪৫২)
এই ৬টি স্পর্শকাতর ও মৌলিক বিষয়ের ওপর মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ব্যাপক ও গভীর গবেষণা চালান। তিনি হাদীসের কিতাব, সাহাবী ও তাবেয়ীদের আমল এবং প্রাচীন ইমামদের ফতোয়া ঘেঁটে বেশ কয়েকটি গবেষণা পত্র তৈরি করেন। দীর্ঘ এই তাত্ত্বিক গবেষণার পর তিনি চূড়ান্ত ও অকাট্য এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে—
“দলিলের দিক থেকে সালাফী আলেমগণ দেওবন্দী আলেমদের থেকে অনেক অনেক এগিয়ে আছেন। এই ৬টি বিষয়ে দেওবন্দীগণ যেসকল দুর্বল ও যুক্তিভিত্তিক দলিল উপস্থাপন করেছেন, তার তুলনায় সালাফী আলেমদের কুরআন ও সহীহ হাদীস ভিত্তিক দলিলগুলো অনেক বেশি নির্ভুল ও সঠিক।”
১০. উপমহাদেশীয় ফিরকা ও হাদীসের নামে জালিয়াতি উন্মোচন
এই সত্য উন্মোচনের পর তাঁর সামনে এক বিশাল প্রশ্ন এসে দাঁড়াল—”তাহলে এখন আমি কার অনুসরণ করব? সালাফী নাকি দেওবন্দী?” এই জটিল প্রশ্নের সঠিক উত্তর খোঁজার জন্য মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন মনে মনে এক দৃঢ় নিয়ত বা সংকল্প করলেন যে, তিনি ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত সমস্ত ধর্মীয় ফিরকা বা দল সম্পর্কে একটি করে নিরপেক্ষ ও তথ্যবহুল গবেষণাপত্র লিখবেন; যেখানে প্রতিটি দলের মূল আকিদা, বিশ্বাসের উৎস এবং আমলগুলো দলীলসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হবে। গবেষণা করতে গিয়ে তিনি দেখলেন, উপমহাদেশে শত শত ছোট-বড় উপদল থাকলেও প্রধানত ৫টি বড় ফিরকা বা ধারা ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে:
১. শীয়া ফিরকা: (আহলে বাইতের অন্ধ ভালোবাসার নামে সাহাবায়ে কেরামের শত্রুতা ও আকিদাগত বিচ্যুতি)।
২. বেরেলভী বা রিজভী ফিরকা: (যারা সম্পূর্ণ পীর, মাজার, কবর ও বিদআত কেন্দ্রিক আমল করে)।
৩. দেওবন্দী ফিরকা: (কওমী মাদ্রাসা, দাওয়াত ও তাবলীগী জামায়াত এবং চরমোনাই সিলসিলা)।
৪. জামায়াতে ইসলামী: (ইসলামের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও ছাত্র শিবির)।
5. আহলে হাদীস বা সালাফী ধারা: (মাযহাবের অন্ধ তাকলীদ মুক্ত হয়ে সরাসরি কুরআন ও সহীহ হাদীসের অনুসারী)।
এই ফিরকাগুলো সম্পর্কে তিনি গভীর গবেষণার মাধ্যমে ৫টি তথ্যসমৃদ্ধ গবেষণাপত্র তৈরি করেন। তার গবেষণাপত্রের লিংক নিচে দেওয়া আছে।
| ফির্কার নাম | গবেষণাপত্র |
| শীয়া ফির্কা | পড়ার লিংক |
| কাদিয়ানি ফির্কা | পড়ার লিংক |
| বেরেলভী বা রিজভী ফিরকা | পড়ার লিংক |
| দেওবন্দী ফির্কা | পড়ার লিংক |
| জামায়াতে ইসলামি | পড়ার লিংক |
| আহলে হাদিস বা সালাফি | পড়ার লিংক |
গবেষণার পর তিনি স্পষ্টভাবে দেখতে পান যে, শীয়া, কাদিয়ানি এবং বেরেলভী মূলত বাতিল ও চরম বিভ্রান্ত ফিরকা। এদের আকিদাগত বিভ্রান্তি নিয়ে তিনি পরবর্তীতে পৃথক ও গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন- শীয়া আকিদার অসারতা নিয়ে তিনি রচনা করেন “শীয়া মতাদর্শ ও ইসলাম’ নামে একটি গ্রন্থ। আর বাকি তিনটি ফিরকার (দেওবন্দী, জামায়াত ও আহলে হাদীস) মধ্যে আমল ও রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক মতভেদ ও তীব্র বিরোধ থাকলেও, তারা মৌলিকভাবে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামায়াত’-এর অন্তর্ভুক্ত। এদের মাঝে পরস্পর চমর বিরোধী আলেম থাকার পাশাপাশি সহানুভুতিশীর মধ্যম পন্থার আলেমও আছে।
সহিহ ও বিশুদ্ধ আকিদা ও আমলের ক্ষেত্র আহলে হাদিস বা সলাফিগণ এগিয়ে আছে। দেওবন্দীগণ আমলে ক্ষেত্রে হানাফি মাজহার অনুসরণ করলেও আকিদায় তারা ‘আশারি ও মাতুরীদি’ (লিংকের বইয়ের পৃ-২২) অনুসরণ করে। তাদের আমলের জজবা বা পরিমান অন্য যে কোন ফির্কার থেকে বেশী। আমলের ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে থাকলেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগামের জামায়াতে ইসলামি অন্য দুই ফির্কা থেকে অনেক এগিয়ে। মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন গবেষনায় দেখিয়েছেন মাওলানা সাইয়েদ মওদুদীর উপর যতগুলো অধিযোগ করা হয় তার ৯০% -ই মিথ্যা ও বানোয়াট। অধিকাংশ সমালোচক তাদের ভুলত্রুটির উপর কোন গবেষনা না করে শুধু শুনা কথা উপর ভিত্তি করে সাইয়েদ মওদুদি (রহ.) উপর সমালোচনার ছুরি চালন হয়।
এই সুদীর্ঘ ও অক্লান্ত গবেষণার সুমিষ্ট ফল হিসেবে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের মনের মণিকোঠায় শির্ক, বিদআত এবং সহীহ ও যয়ীফ হাদীসের পার্থক্য সম্পর্কে এক সুষ্পষ্ট ও কাচের মতো স্বচ্ছ জ্ঞানের আলো জ্বলে ওঠে। তিনি পরম সত্য ও সুক্ষ্ম মিথ্যার মাঝের দেয়ালটি দেখতে পান এবং সঠিক পথ বেছে নিতে সক্ষম হন।
১১. জীবনের মোড় ঘোরানো কিতাবসমূহ ও আত্মোপলব্ধি
২০১২ সালের দিকে তিনি প্রথম বারের মত পরিচিত লাভ করেন কিছু অসাধরণ কিতাব। তার মাঝে অন্যতম ছিল- আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরী (রহ.)-এর লেখা বিখ্যাত বই ‘প্রচলিত জাল হাদীস’ , মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক এর লেখা “প্রচলিত জাল হাদিস” ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মুহাদ্দিস ড. খন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) -এর যুগান্তকারী গ্রন্থ “হাদিসের নামে জালিয়াতি’।
এই বইতিনটি গ্রন্থ পাঠ করার পর তাঁর ভেতরের সঠিক ইসলাম মুল্যবোধের সত্তা জেগে ওঠে। তিনি উপমহাদেশে প্রচলিত মিথ্যা ভিত্তিহীন জাল হাদিস সম্পর্ক একটা স্বচ্ছ ও ষ্পষ্ট ধারনা পান। মনের অগচরে প্রতিটি বিষয় বার বার পড়ে অন্তর থেকে জার হাদিসের আমল ও আকিদা থেকে নিজেকে দুর রাখতে কঠোর চেষ্টা করতে থাকেন। এ কারণ তার ভীতরে এক সত্য দ্বীন প্রচারের বাসনা তৈরি হয়। তিনি ভাবতেন যদি সকল মুসলিম এখানে সঠিক দ্বীন সম্পর্কে জানত ও মানত। জাল হাদিস সম্পর্কে জ্ঞান আসার পর তিনি আর কোনোভাবেই তাবলীগে গিয়ে আগের মতো যা শুনছেন তা-ই নিয়ে বয়ান দিতে পারতেন না। যখনই তিনি বয়ান করতে দাঁড়াতে চাইতেন, তাঁর বিবেকের ভেতরে তীব্র দংশন হতো; মনে হতো—
“আমি তো এখন সাধারণ মানুষের সামনে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নামে রসালো কিন্তু সম্পূর্ণ জাল ও যয়ীফ হাদীসের চর্চা করতে যাচ্ছি!”
তিনি রাসুল (সা.) সেই সতর্ক বাণী মনে করতেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তোমরা আমার উপর মিথ্যারোপ করো না। কারণ আমার উপর যে মিথ্যারোপ করবে সে জাহান্নামে যাবে। সহিহ বুখারি : ১০৬
বিশেষ করে ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.)-এর ‘হাদিসের নামে জালিয়াতি’ বইটি তাঁর ভেতরের অন্ধত্বের চক্ষু চিরতরে খুলে দেয়। এই অমূল্য বইটি সম্পর্কে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন অত্যন্ত আবেগঘন ও কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন–
“হাদিসের নামে জালিয়াতি বইটির উপকারিতা ও মহত্ত্বের কথা আমার সাধারণ ভাষায় যা বলব তা কমই হবে। আমি এ বইটির অসংখ্য কপি ক্রয় করে উপহার দিয়েছি। বিভিন্ন মসজিদের সম্মানিত খতীব ও ইমাম সাহেবদের নিকট উপহার হিসেবে তুলে দিয়েছি, নিজের আত্মীয়-স্বজনদের দিয়েছি। এমনকি বিভিন্ন মসজিদের সাধারণ পাঠকদের পড়ার জন্য মসজিদের তাকে রেখে দিয়েছি। আর আমার নিজের বাসায় তো এই কিতাব সার্বক্ষণিক অধ্যয়নের জন্য আছেই।
কেননা, এই একটি মাত্র বই-ই পারে বাংলাভাষার সাধারণ ও সরলমনা পাঠকদের হাদীস শাস্ত্র সম্পর্কে এক্কেবারে বিশুদ্ধ ও নির্ভেজাল জ্ঞান দিতে। আপনি যদি কোনো মসজিদের ইমাম বা খতীব হন, তবে মিম্বরে দাঁড়িয়ে জুমার খুতবা দেওয়ার আগে আপনার খুতবার হাদীসগুলো অবশ্যই এই বইটির সাথে মিলিয়ে নিবেন। আপনি যদি আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করেন, তবে এই বইটি আগে নিজে পড়ে সহিহ হাদিস ও জাল হাদিসের পার্থক্য জানুন, তারপর দাওয়াতের ময়দানে নামুন। আপনি যদি দেশের কোনো নামকরা বক্তা বা ওয়ায়েজ হন, তবে অবশ্যই এই বই পড়ার পর মঞ্চে মাইক্রোফোনের সামনে উঠবেন। এতে আপনার ও পুরো মুসলিম উম্মাহর উপকার হবেই হবে, ইনশা আল্লাহ!”
হাদীস যাচাইয়ের এই তৃষ্ণা তাঁকে আরও সামনে নিয়ে যায়। এরপর তিনি অধ্যয়ন করেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.)-এর বিশ্ববিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘সিলসিলাহ আদ-দাঈফাহ’ (যা বাংলায় ‘যঈফ ও জাল হাদীস’ নামে প্রকাশিত)। (যঈফা দেখতে ক্লিক করিন)
এরপর একে একে তাঁর নজরে আসে মাওলানা মুতীউর রহমান ও মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেবের যৌথ লেখনী ‘ ‘এসব হাদীস নয়’, ড. খ. ম. আব্দুর রাজ্জাকের ‘প্রচলিত ভুল-ভ্রান্তি সংশোধন’, মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীনের ‘ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’। সর্বশেষ তিনি হাদীসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য আরও পাঠ করেন প্রফেসর ড. মুফতি মুহাম্মদ মনজুরুর রহমানের ‘মাউযূ হাদীস বা প্রচলিত জাল হাদীস’, আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা এবং মাওলানা ডক্টর শাহ্ মুহাম্মাদ আবদুর রাহীমের ‘জাল হাদীস’ এবং ড. মোহাম্মদ ইমাম হোসেনের ‘সমাজে বহুল প্রচলিত ১০০ জাল হাদীস’।
তিনি লক্ষ্য করলেন, ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের কিতাব বাদে বাকি প্রতিটি বইয়েই সমাজে প্রচলিত প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টির মতো মারাত্মক জাল হাদীসের উল্লেখ আছে। এই মহামূল্যবান কিতাবগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করার পর তিনি নিজেও উম্মাহর কল্যাণে একটি বিশাল ও ঐতিহাসিক কিতাব রচনা করেন, যার নাম দিয়েছেন—হাদীসের নামে ভিত্তিহীন কথা’। ‘এই গ্রন্থে তিনি সমাজে অত্যন্ত সুপরিচিত এবং সাধারণ মানুষের কাছে ‘সহীহ’ বলে সমাদৃত প্রায় ৭০০টি জাল ও ভিত্তিহীন হাদীস দলিল-প্রমাণসহ তুলে ধরেছেন, যা সাধারণ মানুষ সওয়াবের আশায় আমল করে নিজের আমলনামা ধ্বংস করছে।
এরই মাঝে ২০১২ সালে চাকুরির সুবাদে তিনি ‘জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন’ (UN Mission)-এর অংশ হিসেবে আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ কঙ্গোতে (DR Congo) গমন করেন। মিশন চলাকালীন ডিউটির বাইরে যে বিপুল অবসর সময় পেতেন, সেখানে তিনি এক অনন্য রেকর্ড গড়েন। তিনি পবিত্র সহীহ আল-বুখারীর প্রতিটি খণ্ডের অনুবাদ সম্পূর্ণ পাঠ করে শেষ করতে সমর্থ হন। যার ফলে সহীহ হাদীসের যে প্রকৃত রূপ, সৌন্দর্য ও ব্যাকরণ—তা তাঁর হৃদয়ের ক্যানভাসে চিরতরে আঁকা হয়ে যায়।
১২. গোপনে গ্রন্থ রচনা ও নীরব বিপ্লব
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের লেখক জীবনের সূচনা হয়েছিল এক কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। প্রথম জীবনের সেই ৬টি আকিদাগত গবেষণাপত্র (মাযহাব, তাসাউফ, উসীলা, তাবীজ, বরকত ও রওজা জিয়ারত) এবং পরবর্তী ৫টি দলভিত্তিক গবেষণাপত্র (শীয়া, বেরেলভী, দেওবন্দী, জামায়াত ও আহলে হাদীস) লিখতে গিয়ে তিনি অবলীলায় শত শত পৃষ্ঠা লিখে ফেলেছিলেন। এত ব্যাপক গবেষণার পর তিনি বুঝতে পারলেন, একজন মুসলিম হিসেবে সত্য জানার পর ঘরে বসে থাকা অপরাধ। তাঁর মনের ভেতর তীব্র তাগিদ অনুভব করলেন। তিনি মনে মনে ভাবলেন-
“আমি এভাবে অলস বসে না থেকে এই গবেষণালব্ধ বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে কিতাব লিখলে কেমন হয়? আমি যে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক আলো ও তাওহীদের জ্ঞান লাভ করতে পারলাম, তা দেশের আপামর মুসলিমদের নিকট পৌঁছে দেওয়া তো আমার ওপর ফরজ। বিশেষ করে হাদীসের নামে যে ভয়াবহ জালিয়াতি সমাজকে গ্রাস করছে, সেই জ্ঞান মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতেই হবে।”
এই পবিত্র ও বৈপ্লবিক ভাবনা থেকে তিনি জাল ও যঈফ হাদীসের ওপর একটি বৃহৎ গ্রন্থ রচনার নিয়ত করেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে একজন সক্রিয় সৈনিক হিসেবে কর্মরত থাকার কারণে সামরিক আইন অনুযায়ী কতৃপক্ষের অনুমতি ব্যতীত কোনো বই প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না। তদুপরি, তৎকালীন সময়ে দেশে ইসলামবিদ্বেষী ও চরম প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছিল। তিনি যদি কোনো বই লিখছেন বা এমন তাওহীদী আকিদার কথা প্রচার করছেন—তা রাষ্ট্র বা কতৃপক্ষ জানতে পারলে মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চাকরি চলে যেত এবং নানা রকমের রাষ্ট্রীয় হয়রানির শিকার হতে হতো।
তাই তিনি এক চরম ও কঠোর গোপনীয়তার পথ বেছে নিলেন। তিনি সম্পূর্ণ গোপনে গভীর রাতে ও অবসরে একাকী কম্পিউটারের কিবোর্ডে টাইপ করে বইগুলো লিখতে শুরু করলেন। কম্পিউটারের ভেতরের ফোল্ডারে পাসওয়ার্ড দিয়ে ফাইলগুলো লুকিয়ে রাখতেন, যাতে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা তো দূরের কথা, তাঁর নিজের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীও বিন্দুমাত্র টের না পায়।
এই কঠোর ও শ্বাসরুদ্ধকর গোপনীয়তার সাথে তিনি ২০১৩ সাল থেকে একটানা বছরের পর বছর কিতাব লিখে যেতে লাগলেন। কিন্তু চাকুরির বাধ্যবাধকতার কারণে তা প্রকাশ করার কোনো সুযোগ পেলেন না। মাঝে মাঝে অন্য কোনো ছদ্মনামে বইগুলো প্রকাশ করার তীব্র ইচ্ছা জাগলেও, চাকুরির নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আবার ফিরে এসেছেন। এভাবেই কেটে যায় দীর্ঘ একটি দশক—নীরবে, নিভৃতে তৈরি হয় এক বিশাল জ্ঞানের খনি।
১৩. অবসর গ্রহণ ও গ্রন্থ প্রকাশের মহাবিপ্লব
সুদীর্ঘ ৩১ বছরের গৌরবময় সামরিক জীবন শেষে, ২০২৩ সালে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী থেকে ‘জুনিয়র কমিশনড অফিসার’ (JCO) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে অবসর গ্রহণ করেন। চাকুরির শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনের মূল বসন্তের সূচনা হয়। এতদিনের জমিয়ে রাখা সেই স্বপ্নের পাণ্ডুলিপিগুলো আলোর মুখ দেখার জন্য ছটফট করতে থাকে।
অবসর গ্রহণের ঠিক প্রথম বছরেই (২০২৩ সালে) তিনি ‘রিফাইন পাবলিকেশন’ –এর মাধ্যমে একযোগে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ৭টি মৌলিক বই প্রকাশ করে দেশের ইসলামিক পাঠকমহলে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেন।
তাঁর এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বিপ্লব এখানেই থেমে থাকেনি। এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে তিনি নিজের কলম থেকে নিঃসৃত আরও ৭টি মৌলিক গ্রন্থ এবং আরবি থেকে বাংলা ভাষায় নিখুঁতভাবে অনূদিত আরও ১১টি বিশাল অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
বর্তমানে তাঁর রচিত ও অনূদিত লেখার মোট পরিমাণ প্রায় অর্ধশতাধিক (৬৭+)। আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রকাশনা জগতের কিছু নিয়মতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাঁর বাকি মূল্যবান পাণ্ডুলিপিগুলো হয়তো সম্পূর্ণ প্রকাশিত হতে কিছুটা সময় লাগছে; তবে তিনি আশাবাদী যে, খুব শীঘ্রই তাঁর বাকি গবেষণাকর্মগুলোও বাংলার তাওহীদী জনতার হাতে পৌঁছে যাবে।

ইসলামি বই মেলা ২০২৪ সালে মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইন এর লেখা একটি বই প্রকাশক মুহাম্মদ এহতেশাম ড. ফয়জুল হককে উপহার দিচ্ছেন।
উপসংহার: এক কর্মবীর ও সত্যের মশালধারী
মুহাম্মদ ইস্রাফিল হোসাইনের জীবন আমাদের শেখায় যে, সত্যের সন্ধান কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ সাধারণ স্কুল-কলেজে পড়েও, সামরিক বাহিনীর কঠিন শৃঙ্খলার মাঝে থেকেও যদি অন্তরে ইখলাস ও সত্যের ব্যাকুলতা থাকে, তবে মহান আল্লাহ নিজ দায়িত্বে তাঁর হেদায়েতের পথ খুলে দেন।
আজ তিনি কেবল একজন অবসরপ্রাপ্ত বিমান সেনা নন, বরং তিনি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের জন্য একনিষ্ঠ গবেষক, মুহাদ্দিস, অনুবাদক এবং শির্ক-বিদআতের অন্ধকার দূর করার এক সাহসী মশালধারী। মহান আল্লাহ তাঁর এই দ্বীনি খিদমতকে কবুল করুন, তাঁর কলমকে আরও ধারালো করুন এবং এটিকে তাঁর পরকালের নাজাতের উসীলা বানিয়ে দিন। আমীন।